২৫ বছর পর উন্মোচিত হলো মেথিকান্দা হামলায় নিহত বাকপ্রতিবন্ধী নারীর আসল পরিচয়: বগুড়ার ওয়াহিদা বেগম
নরসিংদীর মেথিকান্দা রেলস্টেশনে এক মর্মান্তিক হামলায় নিহত অজ্ঞাতপরিচয় বাকপ্রতিবন্ধী নারীর প্রকৃত পরিচয় দীর্ঘ ২৫ বছর পর উন্মোচিত হয়েছে। সম্প্রতি জানা গেছে, মৃত ওই নারী বগুড়ার ওয়াসীমপুর এলাকার ওয়াহিদা বেগম, যিনি প্রায় আড়াই দশক ধরে নিখোঁজ ছিলেন। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং ওয়াহিদার স্বজনেরা নরসিংদীতে এসে তার কবরের পাশে জিয়ারত করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল নরসিংদীর মেথিকান্দা রেলস্টেশনে। সেখানে একটি সহিংস হামলায় এক অজ্ঞাতপরিচয় নারী নিহত হন। যেহেতু তিনি বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন, তার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় মানুষ ও রেলওয়ের কর্মীরা তাকে ‘ববি বেগম’ নামে চিনতেন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়, এবং তার কবরটি স্থানীয়দের কাছে ‘ববি বেগমের কবর’ নামেই পরিচিতি লাভ করে।
২৫ বছর আগে বগুড়ার ওয়াসীমপুর থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন ওয়াহিদা বেগম। তার পরিবার দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিল। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তার ছবি ও তথ্য প্রচার করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো ফল মেলেনি। ওয়াহিদা বেগম কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে তার পরিবার সূত্রে জানা যায়, যে কারণে তিনি বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
সম্প্রতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে নরসিংদীর মেথিকান্দায় নিহত ‘ববি বেগম’-এর ছবি ও তার সম্পর্কে তথ্য প্রকাশিত হয়। এই ছবিগুলো বগুড়ায় ওয়াহিদা বেগমের পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। ছবিতে ‘ববি বেগম’-এর শারীরিক গঠন, বিশেষ করে তার মুখাবয়ব এবং শরীরের কিছু চিহ্ন দেখে তারা ওয়াহিদার সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুঁজে পান। এরপর তারা নরসিংদী পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজেদের সন্দেহের কথা জানান।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ওয়াহিদা বেগমের পরিবারের সদস্যরা নরসিংদীতে আসেন এবং নিহত নারীর ছবি ও অন্যান্য আলামত যাচাই-বাছাই করেন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই এবং নিখোঁজ জিডির তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর, অবশেষে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মেথিকান্দায় নিহত ‘ববি বেগম’ আসলে বগুড়ার নিখোঁজ ওয়াহিদা বেগম। এই পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে, তেমনি প্রিয়জনের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার খবর পেয়ে ওয়াহিদা বেগমের স্বজনেরা নরসিংদীতে ছুটে আসেন। তারা মেথিকান্দায় তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের দীর্ঘদিনের হারানো স্বজনকে স্মরণ করেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, এত বছর পর হলেও প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা খুঁজে পেয়ে তারা এক ধরনের মানসিক শান্তি পেয়েছেন, যদিও এই সত্য তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তারা মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এই ঘটনা আবারও সমাজে নিখোঁজ ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তকরণের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে বাকপ্রতিবন্ধী বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দীর্ঘসূত্রিতা এড়ানো যায়।
