কুয়াকাটা সৈকতে আবারও মৃত ইরাবতী ডলফিন: সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গভীর উদ্বেগ

কুয়াকাটা সৈকতে আবারও মৃত ইরাবতী ডলফিন: সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গভীর উদ্বেগ

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে সম্প্রতি একটি মৃত ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা সামুদ্রিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রবিবার দুপুরে জোয়ারের পানিতে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সৈকত এলাকায় প্রায় আট ফুট দৈর্ঘ্যের এই ডলফিনটি ভেসে আসে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যা নৌযানের ধাক্কা অথবা মাছ ধরার জালের সঙ্গে সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক কে এম বাচ্চু জানিয়েছেন, ডলফিনের মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো মাঝেমধ্যে মৃত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা ঘটে। তিনি সরকারের কাছে সমুদ্রে ডলফিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কার্যকর গবেষণা পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণীর অকাল মৃত্যু গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী বখতিয়ার রহমান নিশ্চিত করেছেন যে মৃত ডলফিনটি ইরাবতী প্রজাতির। তার ধারণা, ডলফিনটির মৃত্যু তিন থেকে চার দিন আগে হয়েছে। এর শরীরে থাকা রক্তাক্ত দাগ দেখে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, এটি কোনো নৌযানের আঘাত, মাছ ধরার জাল অথবা অন্যান্য মৎস্য আহরণ সরঞ্জামের আঘাতে মারা যেতে পারে। এই অঞ্চলে নৌযান চলাচল বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার প্রবণতা প্রায়শই সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

বখতিয়ার রহমান আরও উল্লেখ করেন, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ, তেল এবং নদী ও মোহনার রাসায়নিক বর্জ্য সামগ্রিকভাবে এই প্রজাতির ডলফিনের জন্য এক বড় হুমকি। এসব দূষণ সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং ডলফিনের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রজনন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি ডলফিন অভয়ারণ্য এলাকায় জালের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জেলে ও জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ডলফিনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

ডলফিন রক্ষা কমিটি নামে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কুয়াকাটা উপকূলে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটির দলনেতা রুমান ইমতিয়াজ বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে উপকূলজুড়ে ডলফিন সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু উদ্ধার নয়, বরং প্রতিরোধের ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

মহিপুর রেঞ্জের বন কর্মকর্তা কে এম মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন বিভাগের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। মৃত ডলফিনটি যথাযথভাবে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, যাতে এর পচনশীল দেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়। তবে, এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটায় পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ডলফিন সংরক্ষণে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। সামুদ্রিক পরিবেশের সুরক্ষা এবং বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।