রাশিয়ার বিশিষ্ট বিরোধী রাজনীতিক ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্য সমালোচক বরিস নাদেজদিন দেশ ছেড়ে বর্তমানে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। সম্প্রতি রুশ সরকার তাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পর তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও দমনপীড়নের আশঙ্কা তৈরি হয়। এর পরই তিনি আকস্মিক ও গোপনীয়ভাবে রুশ ভূখণ্ড ত্যাগ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাকে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা গেছে, যা মূলত তার দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিস নাদেজদিনের এই দেশত্যাগ বর্তমান রুশ রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। গত কয়েক বছর ধরে ক্রেমলিনের স্বৈরাচারী নীতি এবং ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের রুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করেছিলেন নাদেজদিন। সে সময় যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের একটি বড় অংশ তার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহের মিছিলেও ব্যাপক জনসমাগম দেখা গিয়েছিল। তবে রুশ নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে তাকে চূড়ান্ত ব্যালটে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়নি।
নির্বাচন থেকে বাদ পড়ার পরও রুশ সরকারের সমালোচনা থামাননি এই রাজনীতিক। তিনি গণমাধ্যমের সামনে এবং বিভিন্ন ফোরামে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। রাশিয়ার আইন অনুযায়ী, সম্প্রতি তাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দেশটির কঠোর আইন অনুযায়ী এই তকমা পাওয়ার অর্থ হলো—তীব্র রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়া, অর্থ লেনদেনে কড়া নজরদারি এবং যেকোনো মুহূর্তে কারাবাসের মতো ঝুঁকিতে পড়া। মূলত এই আইনি খড়্গ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই নাদেজদিন দেশত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বরিস নাদেজদিনের ফ্রান্সে চলে যাওয়া রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা। দেশের ভেতর ক্রেমলিনবিরোধীদের কণ্ঠস্বর ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। আলেকজান্ডার নাভালনির মৃত্যুর পর রাশিয়ার মূল ধারার রাজনৈতিক বিরোধিতায় বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নাদেজদিনের মতো ব্যক্তিত্বদের দেশত্যাগ প্রমাণ করে যে, বর্তমান রুশ প্রশাসনের অধীনে ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করা বা এমনকি দেশে বসবাস করাও কতটা দুরূহ হয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর নাদেজদিনের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে এবং তিনি দূর থেকে কীভাবে রুশ বিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করবেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফরাসি সরকার বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এখনো তার রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে বরিস নাদেজদিনের এই নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিশ্চিতভাবেই ক্রেমলিনের জন্য একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
Reporter Name 











