বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির গতিধারা বেশ ধীর হয়ে এসেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাতটি বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, পশ্চিমা দেশগুলোতে পোশাকের চাহিদা হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পোশাক খাতের এই ধীরগতির পেছনে প্রধানত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা দায়ী। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ পোশাকের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কারখানগুলোতে। এছাড়া গত কয়েক বছরে কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। ছোট ও মাঝারি কারখানগুলোর জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় অনেকগুলো কারখানা তাদের সক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
তবে কেবল বাহ্যিক কারণই নয়, অভ্যন্তরীণ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও এই প্রবৃদ্ধির হারকে সংকুচিত করেছে। ব্যাংকিং খাতের জটিলতা, এলসি খোলা সংক্রান্ত সমস্যা এবং দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব রপ্তানি প্রক্রিয়াকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পোশাক বা ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে আছে। যদিও বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলো ক্রমশ বাজার দখল করে নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সতর্কবার্তা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং সরকারি পর্যায়ে নীতিগত সংস্কারের দাবি উঠেছে। শিল্পের আধুনিকায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং টেকসই বা পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরির দিকে মনোযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। এছাড়া নতুন নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সরকারি প্রণোদনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি। ২০২৫ সালের এই প্রবৃদ্ধি হার বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ হতে পারে, যেখানে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। সার্বিকভাবে, পোশাক খাতের এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে আগামী দিনগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগই হবে মূল চাবিকাঠি।
