বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ফ্রান্স। আর এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল ফরাসি ফুটবলে দীর্ঘ ১৪ বছরের ‘দিদিয়ের দেশম’ অধ্যায়ের। ডালাসের মাঠে স্পেনের কাছে পাত্তাই পায়নি ফরাসিরা। ম্যাচ শেষে দলের এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রেফারিং নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিদায়ী ফরাসি কোচ দেশম। বিশেষ করে এল সালভাদরের রেফারি ইভান বার্টনের ম্যাচ পরিচালনার যোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ফরাসি ফুটবলে দিদিয়ের দেশমের অবদান অনস্বীকার্য হলেও তাঁর কোচিং দর্শন নিয়ে সবসময়ই সমালোচনা ছিল। রক্ষণাত্মক কৌশল, অতিরিক্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং দলের প্রতিভাবান আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা না দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘকাল ধরে তাঁর পিছু ছাড়েনি। তবে নিজের শেষ টুর্নামেন্টে এসে দেশম তাঁর চেনা ছক থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে দেখা গেছে এক ভিন্ন রূপে—নান্দনিক, সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়েছিল তারা। অনেকেই এই দলকে আশির দশকের ঐতিহ্যবাহী ফরাসি দল কিংবা ২০০২ সালের পরাক্রমশালী ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছিলেন।
দেশমের অধীনে ফ্রান্সের এই কৌশলগত পরিবর্তন ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। বছরের পর বছর ধরে যে ফ্রান্সকে কেবল রক্ষণ সামলাতে দেখা গেছে, তারা এবার মাঠে নেমেছিল প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান ডেম্বেলেদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ মাঠে যে গতি ও সৃজনশীলতার প্রদর্শন করেছে, তা ছিল সত্যিই চোখজুড়ানো। কিন্তু সেমিফাইনালে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের মুখোমুখি হতেই যেন ফরাসিদের সেই ছন্দ কেটে যায়। স্পেনের আধুনিক ফুটবল কৌশলের সামনে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে দেশম তাঁর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখেই কথা বলেন। তবে এবার তাঁর ক্ষোভের তির ছিল রেফারির দিকে। প্রথমার্ধে লুকাস দিনিয়ে স্প্যানিশ তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করলে স্পেনকে পেনাল্টি দেন রেফারি ইভান বার্টন। এই সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে পারেননি দেশম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো একটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ পরিচালনার জন্য এই রেফারির কি পর্যাপ্ত যোগ্যতা ছিল? আমি কেবল আজ হেরেছি বলেই এই কথা বলছি না। ম্যাচের অনেক সিদ্ধান্তই আমাদের বিপক্ষে গেছে, যা দলের মনোবলে প্রভাব ফেলেছে।”
রেফারির সমালোচনা করলেও দলের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করেননি দেশম। স্পেনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য অনেক বড় ছিল, কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। আজ কৌশলগত দিক থেকে আমরা প্রতিপক্ষের চেয়ে পিছিয়ে ছিলাম। স্পেন পুরো ম্যাচটি দুর্দান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।” পরাজয়ের সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়ে এই ফরাসি মাস্টারমাইন্ড বলেন, “সবার আগে এটি আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা। আমি এর জন্য অন্য কাউকে বলির পাঁঠা বানাতে চাই না।”
এই হারের মাধ্যমে ফরাসি ফুটবলে একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। বিগত ১৪ বছরে দেশম ফ্রান্সকে এনে দিয়েছেন অনন্য সব সাফল্য। তাঁর অধীনে ফ্রান্স একবার বিশ্বকাপ জিতেছে, একবার রানার্সআপ হয়েছে এবং এবার সেমিফাইনালে পৌঁছাল। এছাড়া ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও (ইউরো) দলটিকে একবার ফাইনালে ও একবার সেমিফাইনালে তুলেছেন তিনি। পাঁচটি বড় টুর্নামেন্টের চারটিতেই শেষ চারে জায়গা করে নেওয়া যেকোনো কোচের জন্যই এক বিশাল কীর্তি। যদিও সমালোচকদের দাবি, ফ্রান্সের হাতে যে অসাধারণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের প্রজন্ম ছিল, সেই তুলনায় মাত্র একটি বিশ্বকাপ জয় অত্যন্ত নগণ্য। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে দিদিয়ের দেশম ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল কোচ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
