ইরানে টানা আট দিনের মার্কিন বিমান হামলা: পরমাণু কেন্দ্র ও হরমুজ নিয়ে চরম উত্তেজনা
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক সপ্তাহে এক উদ্বেগজনক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় পুরো অঞ্চল এখন বারুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গত টানা আট রাত ধরে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে অবস্থিত একটি নির্মাণাধীন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। ইরান এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এই সংঘাতের সূত্রপাত মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের বিতর্ক থেকে। চলতি বছরের জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় তেহরান সমঝোতা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জন ঠেকানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির ভূ-কৌশলগত নিয়ন্ত্রণই বর্তমান উত্তেজনার আসল কেন্দ্রবিন্দু।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে যখন ইরান তার প্রতিশোধমূলক হামলা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছে। তেহরান কুয়েতের আল আদিরি ক্যাম্প এবং আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে আক্রমণের দাবি করেছে। একইসঙ্গে জর্ডানের আকাশে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন চলতে থাকলে তার ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়া হবে। বিশেষ করে খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন।
পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে ইসরায়েলও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের স্মৃতি এখনো টাটকা, যেখানে ইসরায়েল সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছিল। যদিও এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে তারা সরাসরি আক্রমণ থেকে বিরত ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন মনে করেন, এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন ইরানের জনগণের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা মার্কিন লক্ষ্য অর্জনে উল্টো বাধার সৃষ্টি করবে। সংঘাতের এই নতুন ঢেউ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
