রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পাসে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়, যার ফলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সোমবার (৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় এই রক্তক্ষয়ী ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং গভীর রাত পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে থমথমে অবস্থা বজায় থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বেরোবি শাখা ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে দিনব্যাপী ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। ওই প্রদর্শনীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কিছু ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছিল। প্রদর্শনী চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট ব্যানার ও ছবি অপসারণের দাবি জানান। এ নিয়ে প্রথমে উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় এবং কথা কাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দুই পক্ষের সমর্থকরা লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল ও চেয়ার নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষের বিষয়ে ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিক অভিযোগ করেন যে, প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ছবিগুলো নিয়ে ছাত্রদল আপত্তি তোলে এবং অযৌক্তিকভাবে ব্যানার নামিয়ে ফেলার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তিনি জানান, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানালেও ছাত্রদল তা কর্ণপাত না করে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অন্যদিকে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের ছবি স্থান পেয়েছিল, যা অত্যন্ত আপত্তিকর। তিনি দাবি করেন, এই ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবির পাশে টাঙানোর প্রতিবাদ জানানো হলে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা তাদের ওপর চড়াও হন এবং চেয়ার ছুড়ে মারেন। এছাড়া, ছাত্রশিবির বহিরাগত নেতাকর্মী ও কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের ক্যাম্পাসে এনে এই হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উপাচার্য ও প্রক্টরের হস্তক্ষেপে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে পৌঁছায় তাজহাট থানা পুলিশ। রংপুর মেট্রোপলিটন তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হাতাহাতির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বাহিনী ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। বর্তমানে পরিবেশ শান্ত রয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলছে।
এদিকে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রক্টর ফেরদৌস রহমান জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে দোষীদের শনাক্ত করে অতি দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের নির্ধারণ করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার এই ধরনের সংঘাত সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
Reporter Name 
















