রাজধানী ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত মাত্র ১২ ঘণ্টায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মিরপুর, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও মতিঝিলসহ রাজধানীর অধিকাংশ প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। কর্মজীবী মানুষ, বিশেষ করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেকেই।
জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছে। তবুও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অতীতে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও মেয়ররা ‘১৫ মিনিটে পানি নেমে যাবে’ বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ এবং পানিনিষ্কাশনের মূল ‘আউটলেট’ বা বহির্গমন পথ সচল না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার খালগুলো দখল ও দূষণের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছাতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা কেবল স্বল্প পরিসরের বৃষ্টির পানি সরানোর উপযোগী। কিন্তু ভারী বর্ষণে নালার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে পানি উপচে পড়ে। এছাড়া নালার মুখে জমে থাকা বর্জ্য ও পলি অপসারণে দুর্বলতা জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। নিউমার্কেট এলাকার উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে পিলখানার নালা দিয়ে যে পানি বুড়িগঙ্গায় যেত, তা বন্ধ করে দেওয়ায় এলাকাটিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্বীকার করেছেন যে, অতীতে জলাবদ্ধতা নিয়ে যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল ছিল না। তিনি স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একটি সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা ছাড়া ছোটখাটো প্রকল্প দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের পথগুলো উন্মুক্ত না করা হবে এবং খালগুলো উদ্ধার করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকা খরচ করেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে না।
