মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রয়াণ: শোকস্তব্ধ ইসরায়েলি নেতৃত্ব, পরম বন্ধুকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেতানিয়াহু
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ ও অত্যন্ত প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে। শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর এই মার্কিন নেতার জীবনাবসান ঘটে। তাঁর এই আকস্মিক বিদায় তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে স্তব্ধ ও বিহ্বল করে তুলেছে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণী মহলে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই কট্টরপন্থী সিনেটর।
লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গভীর শোক প্রকাশ করে এক আবেগঘন বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি গ্রাহামকে ইসরায়েলের এক অনন্য ও অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নেতানিয়াহু তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ‘সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সবসময় বিশ্বাস করতেন যে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর প্রয়াণে ইসরায়েল তার ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারাল, অন্যদিকে আমেরিকা হারাল এক মহান দেশপ্রেমিককে। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে হারালাম আমার অত্যন্ত প্রিয় ও বিশ্বস্ত এক বন্ধুকে।’
শুধু নেতানিয়াহুই নন, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পৃথক পৃথক বার্তায় এই মার্কিন সিনেটরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁরা সবাই একযোগে স্বীকার করেছেন যে, তেল আবিবের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে লিন্ডসে গ্রাহাম সবসময় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং মার্কিন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও এক শোকবার্তায় গ্রাহামকে তাদের দেশের পরম বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে নির্বাচিত এই রিপাবলিকান সিনেটর ২০০২ সালে প্রথম মার্কিন সিনেটের সদস্য হন। এরপর নিজের অসামান্য জনপ্রিয়তার কারণে ২০০৮, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০২০ সালেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৪ সালে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ তথা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সাউথ ক্যারোলাইনার তৃতীয় কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। গ্রাহামের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাঁর কর্মময় জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তিনি সবসময় বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের পক্ষে লড়াই করেছেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে লিন্ডসে গ্রাহাম ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্ব। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণের অন্যতম কট্টর সমর্থক ছিলেন তিনি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে এবং তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা নীতিতেও তাঁর গভীর প্রভাব ছিল, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের পেছনে গ্রাহামের বড় ভূমিকা ছিল। একসময় ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হলেও পরবর্তীতে তিনি ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হন।
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে লিন্ডসে গ্রাহাম মার্কিন বিমানবাহিনীতে (ইউএস এয়ারফোর্স) একজন আইনজীবী হিসেবে প্রায় ছয় বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিমানবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে কর্নেল পদমর্যাদা নিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। এমনকি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়েও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হত্যার প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন এই বিতর্কিত অথচ প্রভাবশালী মার্কিন নেতা। তাঁর এই চিরবিদায় মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের একটি যুগের অবসান ঘটাল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
