দুই বছর পর ডিএসইতে রেকর্ড লেনদেন: এক দিনেই ৫৩ কোটি শেয়ারের হাতবদল
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এক দিনে লেনদেন ও সূচকের বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের (২৩ মাস) ব্যবধানে বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স-ও ৫ হাজার ৮০০ পয়েন্টের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং শেয়ার হাতবদলের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে এই ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেনের এই গতি শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আজ সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এটি গত ২৩ মাসের মধ্যে ডিএসইর সর্বোচ্চ দৈনিক লেনদেন। আজ লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পূর্ববর্তী দিনের চেয়ে ৪৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৪৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের এই অবস্থানও গত প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। লেনদেন ও সূচকের এই যুগপৎ উত্থান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কেবল লেনদেন বা সূচকের মাইলফলকই নয়, আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার ও বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট হাতবদলের ক্ষেত্রেও নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আজ ডিএসইতে প্রায় ৫২ কোটি ৭০ লাখ শেয়ার ও ইউনিটের হাতবদল হয়েছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে একক দিনে সর্বোচ্চ। বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ শেয়ার হাতবদল হওয়ার অর্থ হলো বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেমন বাজারে ফিরতে শুরু করেছেন, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তাও বেড়েছে। ভালো মানের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের এই বাড়তি চাহিদাই বাজারকে চাঙ্গা করে তুলেছে।
বাজারের এই আকস্মিক ও ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার পর থেকেই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আগ্রহ পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এছাড়া সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও শেয়ারবাজারের গতি ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের নীতিগত সমর্থন ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দৈনিক লেনদেনে।
আজকের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সূচকের এই বড় উত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে বেশ কয়েকটি বড় মূলধনী ও ভালো মানের কোম্পানি। লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ ডিএসইএক্স সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইডিএলসি, সিটি ব্যাংক, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সামিট পাওয়ার এবং লাভেলো আইসক্রিম। এই ১০টি কোম্পানির শেয়ারের দরবৃদ্ধির কারণেই আজ ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ৩২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, আজ লেনদেনের শীর্ষস্থান দখল করেছে লাভেলো আইসক্রিম, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ কোটি টাকা, যা ডিএসইর মোট দৈনিক লেনদেনের প্রায় ৪.২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) প্রায় ৪৫ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আজ মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় সবার শীর্ষে ছিল বিমা এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাত। দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০টি কোম্পানির মধ্যে ৩টি ছিল বিমা খাতের এবং বাকি ৭টিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর রেয়াত পাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সীমা তুলে নেওয়া এবং বিএসইসির পক্ষ থেকে এই খাতকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতির কারণে বিনিয়োগকারীরা মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন। অপরদিকে, আজ দরপতনের তালিকায় শীর্ষে ছিল দুর্বল ও বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলো। সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে, সেগুলোকে বাজার থেকে তালিকাচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং শেয়ার কারসাজি রোধে নজরদারি বাড়ানো হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
