Dhaka ০১:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর সিল ও স্বাক্ষর নকল করে তদবির বাণিজ্য: চক্রের মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার ৫

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ Time View

প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সিল ও অফিশিয়াল লেটারহেড প্যাড জাল করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা ও তদবির বাণিজ্য চালিয়ে আসা একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এই চক্রের মূল হোতাসহ মোট পাঁচজন সদস্যকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছিল।

রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর প্রতারণা চক্রের আটকের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান। তিনি জানান, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের একটি বিশেষ দল সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা থেকে এই চক্রের মূল হোতা ফারুক হোসেন এবং তার সহযোগী সাকিব খানকে আটক করে। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে একই এলাকা থেকে মীর তৌহিদুল ইসলাম নামের আরও এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বকুল মন্ডল এবং কালকিনি থানা পুলিশের সহায়তায় মাসুম মুনসীকে এই মামলায় নিজেদের হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চক্রের মূল হোতা ফারুক হোসেন ২০০৬ সালে তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম বা অন্য কোনো কারণে ২০১৪ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি হারানোর পর থেকেই তিনি জীবিকা নির্বাহ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে জালিয়াতির পথ বেছে নেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারুক অত্যন্ত সুকৌশলে প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সচিবদের স্বাক্ষর ও সিল নকল করে একটি বিশাল জালিয়াতির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র ও চিঠিপত্রে প্রধানমন্ত্রীর ‘অগ্রাধিকার’ সিল ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালাতেন তিনি।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযুক্তরা কেবল কাগজের নথিপত্র জালিয়াতি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা প্রযুক্তির অপব্যবহারও করেছে। চক্রটি প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসারের ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিল এবং সেই অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ভুয়া ওই আইডি ব্যবহার করে চাকরি পুনর্বহাল এবং জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত বিভিন্ন ভুয়া সুপারিশপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করা হতো। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম ও পদমর্যাদা অপব্যবহার করে এভাবে তারা বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা আদায়ের পাঁয়তারা চালাচ্ছিল।

অভিযানকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ও জালিয়াতির সরঞ্জাম জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের অফিসিয়াল লেটারহেড প্যাডের চার বান্ডিল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সিল ও স্বাক্ষর সংবলিত মোট ৪১টি সিলমোহর। পাশাপাশি প্রতারণার কাজে সরাসরি ব্যবহৃত আটটি মোবাইল ফোন, দুটি কম্পিউটার এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। এই ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি সূত্র।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের অন্য কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং জালিয়াত চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা উন্মোচনে রিমান্ডে এনে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। সরকারি সিল ও স্বাক্ষর জাল করে এ ধরনের প্রতারণা রোধে এবং দপ্তিক কাজে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও কঠোর নজরদারি শুরু করেছে।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

নেত্রকোনায় ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় খালের পানিতে ডুবে কলেজছাত্রের মৃত্যু

প্রধানমন্ত্রীর সিল ও স্বাক্ষর নকল করে তদবির বাণিজ্য: চক্রের মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার ৫

Update Time : ১২:০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সিল ও অফিশিয়াল লেটারহেড প্যাড জাল করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা ও তদবির বাণিজ্য চালিয়ে আসা একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এই চক্রের মূল হোতাসহ মোট পাঁচজন সদস্যকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছিল।

রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর প্রতারণা চক্রের আটকের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান। তিনি জানান, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের একটি বিশেষ দল সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা থেকে এই চক্রের মূল হোতা ফারুক হোসেন এবং তার সহযোগী সাকিব খানকে আটক করে। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে একই এলাকা থেকে মীর তৌহিদুল ইসলাম নামের আরও এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বকুল মন্ডল এবং কালকিনি থানা পুলিশের সহায়তায় মাসুম মুনসীকে এই মামলায় নিজেদের হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চক্রের মূল হোতা ফারুক হোসেন ২০০৬ সালে তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম বা অন্য কোনো কারণে ২০১৪ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি হারানোর পর থেকেই তিনি জীবিকা নির্বাহ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে জালিয়াতির পথ বেছে নেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারুক অত্যন্ত সুকৌশলে প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সচিবদের স্বাক্ষর ও সিল নকল করে একটি বিশাল জালিয়াতির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র ও চিঠিপত্রে প্রধানমন্ত্রীর ‘অগ্রাধিকার’ সিল ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালাতেন তিনি।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযুক্তরা কেবল কাগজের নথিপত্র জালিয়াতি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা প্রযুক্তির অপব্যবহারও করেছে। চক্রটি প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসারের ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিল এবং সেই অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ভুয়া ওই আইডি ব্যবহার করে চাকরি পুনর্বহাল এবং জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত বিভিন্ন ভুয়া সুপারিশপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করা হতো। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম ও পদমর্যাদা অপব্যবহার করে এভাবে তারা বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা আদায়ের পাঁয়তারা চালাচ্ছিল।

অভিযানকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ও জালিয়াতির সরঞ্জাম জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের অফিসিয়াল লেটারহেড প্যাডের চার বান্ডিল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সিল ও স্বাক্ষর সংবলিত মোট ৪১টি সিলমোহর। পাশাপাশি প্রতারণার কাজে সরাসরি ব্যবহৃত আটটি মোবাইল ফোন, দুটি কম্পিউটার এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। এই ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি সূত্র।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের অন্য কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং জালিয়াত চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা উন্মোচনে রিমান্ডে এনে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। সরকারি সিল ও স্বাক্ষর জাল করে এ ধরনের প্রতারণা রোধে এবং দপ্তিক কাজে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও কঠোর নজরদারি শুরু করেছে।