একটি নিখুঁত ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ বা খুনের রহস্যের সার্থকতা তখনই ফুটে ওঠে, যখন সেটি কেবল ‘খুনি কে’ সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে, বরং ‘কেন খুনটি ঘটল’ সেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো ব্যবচ্ছেদ করে। দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটতে হলে রহস্যের সাথে মিশে থাকতে হয় সম্পর্কের জটিলতা, ক্ষমতার সমীকরণ এবং সমসাময়িক সমাজের রূঢ় বাস্তবতা। আগাথা ক্রিস্টির ক্ল্যাসিক উপন্যাস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ‘নাইভস আউট’ ফ্র্যাঞ্চাইজি—সফল সব রহস্যগল্পই এই মূলনীতি অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে। সেই একই ধারায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ফরাসি মিনি সিরিজ ‘সামার ৩৬’।
নির্মাতা মারি দেশাইরে ও ক্যাথরিন তুজে পরিচালিত এই ছয় পর্বের সিরিজটি মূলত ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সের এক উত্তাল সময়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফরাসি ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে সদ্য ক্ষমতায় এসেছে ‘পপুলার ফ্রন্ট’ সরকার। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ বেতনসহ ছুটি কাটানোর অধিকার লাভ করে। এর আগে ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো ছিল কেবল আভিজাত্য ও উচ্চবিত্তদের চারণভূমি। কিন্তু সরকারি নতুন নিয়মের ফলে সাধারণ শ্রমিক পরিবারগুলোও সেখানে অবকাশ যাপনের সুযোগ পায়। আভিজাত্যের সেই প্রথাগত দুর্গে সাধারণ মানুষের পদচারণা যে এক নীরব সামাজিক সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল, সিরিজটিতে সেই প্রেক্ষাপটকেই রহস্যের মূল ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গল্পের শুরু হয় কাল্পনিক ‘রিভিয়েরা হোটেল’কে কেন্দ্র করে। উৎসবের আবহের মধ্যেই হোটেলের একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রভাবশালী সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকারের (আরনাড বিনার্ড) নিথর দেহ। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ খুন মনে হলেও তদন্ত শুরু হতেই বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হোটেলটিতে অবস্থানরত চারজন নারী—ইউজেনি বার্থিয়ে, লেউনি মোরেল, ব্লঁশ আকেরমান ও জুলিয়া ভিনসেন্টের প্রত্যেকেরই নিহত কৌঁসুলির বিরুদ্ধে ছিল ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা পুরোনো কোনো হিসাব। তদন্ত যত গভীরে যায়, দেখা যায় আদ্রিয়াঁ জাকারের জীবনের সাথে এই চার নারীর অতীত কোনো না কোনোভাবে জড়িত। কেউ ছিলেন তার পুরোনো প্রেমিকা, কেউ তার অন্যায়ের শিকার, আবার কারও সাথে ছিল গোপন আর্থিক লেনদেন।
সিরিজটিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সোফিয়া এসাইদি (ইউজেনি চরিত্রে) এবং কনস্ট্যান্স গে (লিওনি চরিত্রে) অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ইউজেনির চরিত্রের মধ্য দিয়ে নির্মাতা এক গভীর আবেগীয় টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে বাবার সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে থাকা লিওনি ফুটিয়ে তুলেছে ন্যায়বিচারের আকুতি। যদিও ব্লঁশ ও জুলিয়া চরিত্রের ব্যাপ্তি আরও কিছুটা বেশি হতে পারত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ফ্রান্সের নিস, গ্রাস ও সসপেল শহরের বাস্তব লোকেশনে চিত্রায়িত এই সিরিজে ১৯৩০-এর দশকের আবহ, পোশাক-আশাক এবং ক্লাসিক গাড়ির ব্যবহার পিরিয়ড ড্রামা হিসেবে সিরিজটিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।
তবে চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও নজরে এসেছে। মাত্র ছয়টি পর্বের মধ্যে অনেকগুলো পার্শ্বচরিত্র এবং তাদের পারস্পরিক জটিল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছু জায়গায় গল্পের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে দর্শকদের জন্য চরিত্রের জাল বোঝা কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও, ১৯৩৬ সালের সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট এবং শ্রমজীবী বনাম অভিজাত শ্রেণির মধ্যকার অদৃশ্য দেয়ালটি সিরিজটিকে কেবল একটি ‘হুইডানিট’ রহস্যের গণ্ডি পেরিয়ে এক সামাজিক দলিলে রূপান্তর করেছে। যারা ইউরোপীয় ঐতিহাসিক রহস্যগল্প পছন্দ করেন, তাদের জন্য ‘সামার ৩৬’ হতে পারে একটি চমৎকার বিনোদন।
Reporter Name 





















