Dhaka ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে আল-জারা হাসপাতালসহ ৫ অবৈধ ক্লিনিক সীলগালা, রোগীর মৃত্যুর পর প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৩৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ Time View

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়। লাইসেন্সবিহীন পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায়ে এই অভিযানে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীলগালা ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এক কলেজছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য রোধে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন।

গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুর রহমান ও নাজমুন নাহার নাঈম। অভিযানে আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেডিকো হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লিলি প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হলিসিটি প্রাইভেট হাসপাতাল এবং মা-মনি ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা অন্য কোনো মানসম্মত医疗 প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে ১৭ বছর বয়সী কলেজছাত্রী আয়েশা আফরিণের অস্ত্রোপচারের পর তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পরপরই বিষয়টি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ওঠে এবং চার সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থেকে শুরু করে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক ত্রুটি ও গাফিলতির চিত্র বেরিয়ে আসে। ৩০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত সরকারি নিয়মনীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ জনবলের তীব্র ঘাটতি ছিল। এছাড়া অস্ত্রোপচার পরবর্তী রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য সিটের পাশে অত্যাধুনিক মনিটরিং যন্ত্রের উপস্থিতি না পাওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মঙ্গলবার আল-জারা হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পান সিভিল সার্জন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ফলশ্রুতিতে হাসপাতালটির সব ধরনের চিকিৎসাসেবা ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই কিশোরীর অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক আতিকুল আহসান—যিনি একজন সহকারী অধ্যাপক ও অভিজ্ঞ সার্জন—তাঁর এই অনিয়মিত কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, ওই চিকিৎসক নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই বেসরকারি হাসপাতালে এসে অপারেশন করায় তাঁকে শোকজ করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বিভাগীয় ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, একই এলাকার আশপাশে গড়ে ওঠা আরও চারটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স বা সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চিকিৎসাব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। কোনো ধরনের তদারকি ছাড়াই সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান স্পষ্ট ভাষায় জানান, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। যেখানেই নিয়ম ভেঙে বা অনুমতি ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রহসন চলবে, সেখানেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সাধারণ নাগরিকরা যাতে হয়রানিমুক্ত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের এই ধরনের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তার নতুন অধ্যায়: মরক্কোর ক্লাবের ডাগআউটে বিশ্ব ফুটবলের রূপকার

ফরিদপুরে আল-জারা হাসপাতালসহ ৫ অবৈধ ক্লিনিক সীলগালা, রোগীর মৃত্যুর পর প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ

Update Time : ০৬:৩৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়। লাইসেন্সবিহীন পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায়ে এই অভিযানে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীলগালা ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এক কলেজছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য রোধে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন।

গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুর রহমান ও নাজমুন নাহার নাঈম। অভিযানে আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেডিকো হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লিলি প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হলিসিটি প্রাইভেট হাসপাতাল এবং মা-মনি ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা অন্য কোনো মানসম্মত医疗 প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে ১৭ বছর বয়সী কলেজছাত্রী আয়েশা আফরিণের অস্ত্রোপচারের পর তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পরপরই বিষয়টি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ওঠে এবং চার সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থেকে শুরু করে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক ত্রুটি ও গাফিলতির চিত্র বেরিয়ে আসে। ৩০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত সরকারি নিয়মনীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ জনবলের তীব্র ঘাটতি ছিল। এছাড়া অস্ত্রোপচার পরবর্তী রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য সিটের পাশে অত্যাধুনিক মনিটরিং যন্ত্রের উপস্থিতি না পাওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মঙ্গলবার আল-জারা হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পান সিভিল সার্জন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ফলশ্রুতিতে হাসপাতালটির সব ধরনের চিকিৎসাসেবা ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই কিশোরীর অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক আতিকুল আহসান—যিনি একজন সহকারী অধ্যাপক ও অভিজ্ঞ সার্জন—তাঁর এই অনিয়মিত কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, ওই চিকিৎসক নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই বেসরকারি হাসপাতালে এসে অপারেশন করায় তাঁকে শোকজ করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বিভাগীয় ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, একই এলাকার আশপাশে গড়ে ওঠা আরও চারটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স বা সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চিকিৎসাব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। কোনো ধরনের তদারকি ছাড়াই সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান স্পষ্ট ভাষায় জানান, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। যেখানেই নিয়ম ভেঙে বা অনুমতি ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রহসন চলবে, সেখানেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সাধারণ নাগরিকরা যাতে হয়রানিমুক্ত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের এই ধরনের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।