Dhaka ০৮:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে দেড় শ কোটি টাকার সীমান্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৩৩:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ Time View

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শাহপরীর দ্বীপের তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ ও সীমান্ত সড়ক মারাত্মক ভাঙনের মুখে পড়েছে। প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই অবকাঠামোটি উদ্বোধনের মাত্র তিন বছরের মাথায় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাগরের প্রবল জোয়ার এবং ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধের ঢালুতে রক্ষিত ভারী সিসি ব্লকগুলো একের পর এক সরে যাচ্ছে। এর ফলে ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে সরাসরি মাটির বাঁধে আঘাত হানছে সামুদ্রিক ঢেউ, যা পুরো জনপদকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী দ্বারা এটি তিন দিক থেকে বেষ্টিত। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশেষ করে পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশ দিয়ে সাগরের উত্তাল ঢেউ সরাসরি আঘাত হানায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অতীতে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলায় শাহপরীর দ্বীপের ভূগোল ও জনজীবনে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভাঙনের ফলে দ্বীপটির আয়তন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও প্রবীণ বাসিন্দাদের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকেও যে দ্বীপের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ অনেক বেশি ছিল, তা সাগরে বিলীন হতে হতে বর্তমানে মারাত্মকভাবে ছোট হয়ে গেছে। প্যারাবনের অনুপস্থিতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। সাগরে সামান্য লঘুচাপ বা ঝড়ের সংকেত দেখা দিলেই জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে ওঠে এবং বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।

এই আকস্মিক ভাঙন ও জোয়ারের হানায় শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া এবং ঘোলাপাড়া এলাকার অন্তত চারশ বসতবাড়ি বর্তমানে সরাসরি সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় জেলে ও নিম্নআয়ের মানুষরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বংশপরম্পরায় সাগরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব মানুষ গত তিন দশকে একাধিকবার ঘরবাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের বসতভিটা ইতোমধ্যে সাগর্গর্ভে চলে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই তাদের সহায়-সম্পত্তি নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন। লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং কৃষিজমি ও গাছপালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে।

এদিকে, ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশাল আকৃতির সিসি ব্লকগুলো একবার স্থানচ্যুত হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পুনরায় স্থাপন করা অসম্ভব। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বর্তমান বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল সাগরে স্থায়ী সংস্কার কাজ চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা স্থগিত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু স্থানে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাগর শান্ত হলে আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের দিকে পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সংস্কার কাজ শুরু হবে। স্থানীয় জনগণের প্রাণের দাবি, অবিলম্বে বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত সিসি ব্লক স্থাপন করে এই জনপদকে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হোক।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

বই ও বিনোদনে বিল গেটসের নতুন পছন্দ: ২০২৬ সালের সেরা বই ও টিভি শোর তালিকা প্রকাশ

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে দেড় শ কোটি টাকার সীমান্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে

Update Time : ০৭:৩৩:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শাহপরীর দ্বীপের তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ ও সীমান্ত সড়ক মারাত্মক ভাঙনের মুখে পড়েছে। প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই অবকাঠামোটি উদ্বোধনের মাত্র তিন বছরের মাথায় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাগরের প্রবল জোয়ার এবং ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধের ঢালুতে রক্ষিত ভারী সিসি ব্লকগুলো একের পর এক সরে যাচ্ছে। এর ফলে ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে সরাসরি মাটির বাঁধে আঘাত হানছে সামুদ্রিক ঢেউ, যা পুরো জনপদকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী দ্বারা এটি তিন দিক থেকে বেষ্টিত। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশেষ করে পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশ দিয়ে সাগরের উত্তাল ঢেউ সরাসরি আঘাত হানায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অতীতে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলায় শাহপরীর দ্বীপের ভূগোল ও জনজীবনে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভাঙনের ফলে দ্বীপটির আয়তন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও প্রবীণ বাসিন্দাদের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকেও যে দ্বীপের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ অনেক বেশি ছিল, তা সাগরে বিলীন হতে হতে বর্তমানে মারাত্মকভাবে ছোট হয়ে গেছে। প্যারাবনের অনুপস্থিতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। সাগরে সামান্য লঘুচাপ বা ঝড়ের সংকেত দেখা দিলেই জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে ওঠে এবং বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।

এই আকস্মিক ভাঙন ও জোয়ারের হানায় শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া এবং ঘোলাপাড়া এলাকার অন্তত চারশ বসতবাড়ি বর্তমানে সরাসরি সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় জেলে ও নিম্নআয়ের মানুষরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বংশপরম্পরায় সাগরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব মানুষ গত তিন দশকে একাধিকবার ঘরবাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের বসতভিটা ইতোমধ্যে সাগর্গর্ভে চলে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই তাদের সহায়-সম্পত্তি নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন। লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং কৃষিজমি ও গাছপালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে।

এদিকে, ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশাল আকৃতির সিসি ব্লকগুলো একবার স্থানচ্যুত হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পুনরায় স্থাপন করা অসম্ভব। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বর্তমান বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল সাগরে স্থায়ী সংস্কার কাজ চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা স্থগিত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু স্থানে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাগর শান্ত হলে আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের দিকে পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সংস্কার কাজ শুরু হবে। স্থানীয় জনগণের প্রাণের দাবি, অবিলম্বে বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত সিসি ব্লক স্থাপন করে এই জনপদকে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হোক।