রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকার জোড়াখাম্বায় অবস্থিত একটি মাদ্রাসার শৌচাগার থেকে মো. নাঈম শেখ (১৩) নামে এক কিশোর শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক দুই শিক্ষককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামানের আদালত এই আদেশ দেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত নাঈমের পরিবারে গভীর শোকের পাশাপাশি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার বেলা দেড়টার দিকে রওয়াজাতুল উলুম হাফিজিয়া নুরানি মাদ্রাসার তৃতীয় তলার একটি শৌচাগার থেকে নাঈমের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই আকস্মিক মৃত্যু এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্তে নামে।
আদালতের নির্দেশে কারাগারে প্রেরিত দুই শিক্ষক হলেন মাদ্রাসার হাফেজ মো. জাকারিয়া (৩৫) এবং হাফেজ মো. জোবায়ের আহম্মেদ (২০)। ঢাকার সিএমএম আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক আবদুস ছবুর এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমজাদ হোসেন দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি চলাকালে আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না, যার ফলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
নিহত নাঈমের মা নাজমা বেগম সোমবার রাতেই কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ওই দুই শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে নাজমা বেগম উল্লেখ করেন যে, নাঈম ও তার ছোট ভাই একই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। কিন্তু বিভিন্ন তুচ্ছ অজুহাতে ওই দুই শিক্ষক প্রায়শই নাঈমকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন। এই নির্যাতনের কথা নাঈম তার মাকে জানালে তিনি তাকে মাদ্রাসা থেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তবে, মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে নাঈমকে বাধ্য হয়ে মাদ্রাসায় থাকতে হয়।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, গত সোমবার দুপুরে নাঈম শিক্ষকদের জানিয়েছিল যে সে আর ওই মাদ্রাসায় পড়তে চায় না। এতে শিক্ষকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করেন। মায়ের দাবি অনুযায়ী, এই মারধরের পর বেলা একটা থেকে আড়াইটার মধ্যে নাঈমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই হত্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং শিক্ষকেরা গ্রেপ্তার হন।
কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত দুই শিক্ষককে আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নাঈমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য মামলার তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। তিনি আরও বলেন, নাঈমের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই তার মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নির্মম নির্যাতনের ঘটনা দেশে এই প্রথম নয়। এই ঘটনা আবারও মাদ্রাসাসহ সকল আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নাঈমের মৃত্যু শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো দাবি তুলেছে। পরিবার এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ন্যায়বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশায় রয়েছে।
Reporter Name 





















