বগুড়ায় ইসলামী ব্যাংকের এক জুনিয়র ট্রেইনি অফিসারকে অপহরণ করে জিম্মি করা এবং মারধরপূর্বক মুক্তিপণ আদায়ের গুরুতর অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অভিযুক্ত ওই নেতার নাম শওকত ইমরান, যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বগুড়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার রাতে ভুক্তভোগী আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় এনসিপি নেতা শওকত ইমরানসহ মোট চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ভুক্তভোগী আশরাফুল ইসলাম ইসলামী ব্যাংকের নওগাঁ শাখায় জুনিয়র ট্রেইনি অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন এবং তাঁর পৈতৃক নিবাস বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায়। গত শনিবার দুপুরের দিকে তিনি বগুড়া শহরের সরকারি আজিজুল হক কলেজের নতুন ভবনের দক্ষিণ গেটসংলগ্ন ইসলামী ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে নিজ বাসভবনে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তিনমাথা রেলগেট এলাকার ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছালে শওকত ইমরান এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন ব্যক্তি দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে গতিরোধ করেন। পরবর্তীতে জোরপূর্বক তাঁকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে শহরের পুরান বগুড়া এলাকার একটি ছাত্রাবাসে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাঁর কাছ থেকে নগদ ৮২ হাজার টাকা, দুটি মুঠোফোন ও ব্যাংকের এটিএম কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে আরও ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এনসিপি নেতা শওকত ইমরান। তাঁর দাবি, আশরাফুল ইসলাম অতীতে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে বিভিন্ন নারীর পরিচয়ে লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ করতেন। শওকত ইমরানের ভাষ্যমতে, তাঁর পরিচিত এক তরুণের কাছ থেকেও আশরাফুল অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ওই টাকা তিনি ফেরত দেন। পাশাপাশি আশরাফুলের মুঠোফোনে আপত্তিকর ও ভুয়া আইডি লগইন পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন যে, একটি মহলের প্ররোচনায় তাঁর সম্মান ক্ষুণ্ন করতেই এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শওকত ইমরানের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে নাহিয়ান ইসলাম নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ব্যক্তিগত গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি গত বছর এপ্রিল মাসেও জলেশ্বরীতলা এলাকার এক বাসিন্দা তাঁর বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছিলেন।
দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা কমিটির আহ্বায়ক এম এস এ মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে আনীত অপহরণ ও extortion-এর অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যদি অভিযোগের ন্যূনতম সত্যতাও পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে, বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানিয়েছেন, ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বগুড়া সদর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শামিম হোসেনকে। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এবং লুণ্ঠিত অর্থ ও মালামাল উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করছে।
Reporter Name 














