মানবজীবনের পথচলায় অপ্রত্যাশিত সংকট, চাকরিচ্যুতি, ব্যবসায়িক বিপর্যয় বা গুরুতর অসুস্থতা প্রায়শই মানুষের জীবনে গভীর হতাশার জন্ম দেয়। যখন চারপাশের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়ে, তখন কোরআনে বর্ণিত নবীদের জীবনদর্শন এবং তাঁদের দোয়ার পন্থাই হতে পারে একমাত্র সান্ত্বনা ও মুক্তির পথ। ইসলামের ইতিহাস ও কোরআনের বিভিন্ন আয়াত বিশ্লেಷণে দেখা যায়, যুগে যুগে নবীরাও তাঁদের জীবনে বহু কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের বর্তমান সংকটগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তবে তাঁরা কখনোই আশাহত হননি; বরং চরম বিপদের মুহূর্তে তাঁরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে বিশেষ কিছু দোয়া ও আধ্যাত্মিক উপায়ে প্রার্থনা করেছেন।
আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এবং ধর্মীয় অনুশীলনের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও এর সত্যতা মিলেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত ড. হ্যারল্ড জি কোয়েনিক ও তাঁর সহকর্মীদের সংকলিত ‘হ্যান্ডবুক অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড হেলথ’ (২০১২) শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চরম সংকটের মুহূর্তে প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক চর্চা মানুষের মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে সাহায্য করে। যারা বিপদের সময় বিশ্বাসের আশ্রয় নেন, তাদের মানসিক পুনরুদ্ধার বা রিবাউন্ড করার গতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে নবী ইব্রাহিম, ইউনুস, আইয়ুব, মুসা ও জাকারিয়া (আ.)-এর জীবনের বিভিন্ন চরম সংকটের মুহূর্ত এবং তাঁদের প্রার্থনার ধরণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংকট থেকে উত্তরণে নবীদের অনুসৃত পদ্ধতিতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় লক্ষণীয়: আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাবর্তন করা, নিজের সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা স্বীকার করে নেওয়া এবং আল্লাহর অসীম রহমতের ওপর অবিচল ভরসা রাখা। উদাহরণস্বরূপ, সুরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে তিন স্তরের অন্ধকার—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকারের মধ্যে নবী ইউনুস (আ.)-এর দোয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমিন’ (তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত)। এই দোয়ায় কোনো অভিযোগ বা কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল নিখাদ তাওহিদের স্বীকৃতি এবং নিজের ভুল স্বীকারের অপূর্ব মানসিকতা। এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমস্ত দুশ্চিন্তা ও বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং পবিত্র হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহর জন্য এই দোয়ার বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করেছেন।
একইভাবে, দীর্ঘ রোগভোগ এবং আপনজনদের দূরত্বের মুখেও নবী আইয়ুব (আ.) কখনো অভিযোগের ভাষা ব্যবহার করেননি। তিনি অত্যন্ত সরলভাবে শুধু বলেছেন, ‘আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে এবং তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের হাত থেকে বাঁচতে মিশরের বাইরে সম্পূর্ণ একা ও নিঃস্ব অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তিনি পরম করুণাময়ের দরবারে নিজেকে সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল হিসেবে উপস্থাপন করে দোয়া করেছিলেন। জাকারিয়া (আ.) বার্ধক্যে উপনীত হওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁর স্ত্রী বন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও যখন সন্তান লাভের প্রার্থনা করেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে কোনো জোরাজুরি না করে কেবল ‘তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী’ বলে আকুতি জানিয়েছেন। কোরআনের এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, নবীরা কখনো নিজের যোগ্যতা বা ভালো কাজের বড়াই করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাননি; বরং তাঁরা নিজেদের চরম অসহায়ত্ব ও আল্লাহর অপরিসীম ক্ষমতার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন।
বর্তমান আধুনিক যুগেও যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি চরম হতাশায় বা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েন, তখন শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিজের মনের কথাগুলো সরল ভাষায় আল্লাহর কাছে পেশ করা উচিত। কোনো দীর্ঘ বা কৃত্রিম বাকচাতুর্যের প্রয়োজন নেই; নিজের প্রয়োজন ও অপারগতা অকপটে তুলে ধরলেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের বিষয়টি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও কল্যাণকর—সুখ এলে সে শুকরিয়া আদায় করে যা তার জন্য কল্যাণকর, আর বিপদ এলে সে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে যা তার জন্য আরও বেশি কল্যাণকর। তাই জীবনের যেকোনো কঠিন বাঁকে ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা এবং নবীদের সুন্নাত অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি।
Reporter Name 


















