দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব জাস্টিস, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যু এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত সংবাদ, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে দেশে মোট ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন এবং আহত হয়েছেন ১৬৪ জন। এর আগের মাস জুনের তুলনায় সহিংসতার সংখ্যা কিছুটা কমলেও হতাহতের ধরন ও তীব্রতা ছিল উদ্বেগজনক। জুনে ৫৮টি সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছিলেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা এই সহিংসতার মূল কারণ। জুলাই মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৪টি ঘটনায় দুজন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন। এছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সংঘর্ষ, বিএনপি-আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক সংঘাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার বাইরেও দুষ্কৃতকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। এই ধরনের সাতটি হামলায় পাঁচজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। দেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জেরে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
জুলাই মাসের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর চিত্র। এইচআরএসএসের তথ্যমতে, পুলিশ ও ডিবি হেফাজতে মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন কারাগারে অসুস্থতাসহ নানা কারণে অন্তত ১০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ কয়েদির পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলার আসামিও রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আরেকটি বড় দিক ছিল দেশজুড়ে মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ সহিংসতা। চুরির অপবাদ, আধিপত্য বিস্তার, এমনকি ধর্ম অবমাননার মতো অভিযোগে ৪৯টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা এবং নির্যাতনও ছিল জুলাই মাসের একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ৩৬টি ভিন্ন ঘটনায় ৫৫ জন সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন আহত, ৯ জন লাঞ্ছিত এবং ৮ জন সরাসরি হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া তিনজন সাংবাদিককে আটক এবং কয়েকটি মামলায় বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল বেশ নাজুক। জুলাই মাসে মোট ২৫৮ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৫ জন নারী ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অসংখ্য অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের বলি এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও সমাজের গভীর সংকটকে ফুটিয়ে তোলে। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যান ভয়ংকর; ৩৪টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
সব মিলিয়ে, এইচআরএসএসের এই প্রতিবেদন দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, আইনের শাসন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি না পেলে এই ধরনের সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করা সম্ভব হবে না।
Reporter Name 















