দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা তথা দেশের নাট্যাঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসছে আরণ্যক নাট্যদলের অন্যতম শক্তিশালী প্রযোজনা ‘কম্পানি’। প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় নির্মিত এই নাটকটি আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে প্রদর্শিত হবে। আরণ্যক নাট্যদলের ৬৬তম এই প্রযোজনাটি মূলত ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থান এবং বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের করুণ পরিণতিকে উপজীব্য করে রচিত। ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রথম মঞ্চে আসার পর থেকেই নাটকটি তার সাহসী ও শৈল্পিক উপস্থাপনার জন্য নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল।
নাটকটির প্রেক্ষাপটে ফুটে উঠেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত বাণিজ্যিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ ইতিহাস। কীভাবে একটি বিদেশি বণিক গোষ্ঠী ব্যবসায়িক সুবিধার আড়ালে ষড়যন্ত্র, বিভাজন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বাংলার শাসনব্যবস্থাকে কব্জা করেছিল, তার প্রতিটি পর্যায় মঞ্চে নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রবার্ট ক্লাইভের চতুরতা, মীর জাফর ও জগৎশেঠের বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরিশেষে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের যে করুণ আখ্যান, তা আজকের দর্শকের কাছে এক নতুন উপলব্ধির খোরাক যোগায়। নাটকটি শুধু ইতিহাসের পাতা থেকে সংগৃহীত ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং এটি ক্ষমতার রাজনীতির এক চিরন্তন দলিল।
মামুনুর রশীদের ভাষ্যমতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেই সময়ের লুটপাট এবং ক্ষমতা দখলের কৌশল বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে অদ্ভূতভাবে মিলে যায়। তিনি মনে করেন, বণিকদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে ইতিহাস, তা কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়; বরং আজকের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও তার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। সম্পদের পাচার এবং লুণ্ঠনের সংস্কৃতি আজও ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে বিদ্যমান, যা নাটকটিকে সমকালীন বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। নাটকের শেষ দৃশ্যে শিল্পপতির চরিত্রে মামুনুর রশীদের উপস্থিতি দর্শকদের সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পেরেছি, নাকি নতুন কোনো করপোরেট ‘কোম্পানি’ আমাদের শাসন করছে?
এই নাটকে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ, সাজ্জাদ সাজু, আরিফ হোসেন আপেল, কামরুল হাসান, রুবলী চৌধুরীসহ আরণ্যকের একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী। গানের ব্যবহার, নান্দনিক ভাষা এবং ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে নির্দেশক মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। শুধু বিনোদন নয়, বরং ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ক্ষমতা থাকায় ‘কম্পানি’ নাটকটি বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিল্পকলা একাডেমির এই প্রদর্শনীটি সচেতন দর্শক মহলে পুনরায় গভীর আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
Reporter Name 




















