Dhaka ০৭:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্রাজিলের প্রবীণ নেতা লুলা দা সিলভা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:০৪:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ Time View

লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র ব্রাজিলে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আসন্ন অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে লড়াই করার ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। সাও পাওলোতে ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) এক বিশাল সমাবেশে ৮০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নেতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যদি এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হন, তবে সেটিই হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ মেয়াদ।

এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রচলিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির চেয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের কঠোর বিরোধিতাকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে বেছে নিয়েছেন লুলা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি তাঁর একটি সুচিন্তিত কৌশল। সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া জ্বালাময়ী ভাষণে ব্রাজিলের প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও বিরল খনিজগুলোর ওপর বিদেশি একাধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন।

লুলা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্স—বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তি হোক না কেন, ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলে দেশের খনিজ সম্পদ আহরণের কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মাঝেই এমন মন্তব্য করলেন ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট। গত জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করে, যার পেছনে অন্যায্য বাণিজ্যনীতির অভিযোগ তোলা হয়। যদিও ব্রাসিলিয়া সেই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ব্রাজিলের দক্ষিণপন্থী বলসোনারো পরিবারের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো নির্বাচনী ফল উল্টানোর ষড়যন্ত্র মামলায় দণ্ডিত হয়ে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকায়, তাঁর বড় ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো এবার ডানপন্থী শিবিরের প্রধান মুখ হিসেবে লুলার বিরুদ্ধে লড়ছেন।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লুলা তাঁর সরকারের বিগত মেয়াদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বেকারত্ব হ্রাস এবং দারিদ্র্য বিমোচনে নেওয়া বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির সাফল্যকে সামনে নিয়ে আসছেন। তাঁর দাবি, এসব জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপের ফলে লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের সামনেও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং দেশের কিছু অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কারণে অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভোটারদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এমনকি দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের শীর্ষ নেতাদের ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও নির্বাচনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। ডেটাফোলহার সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলা ৪৮ শতাংশ এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেতে পারেন। দেশবাসীর একটি বড় অংশ এখনো বামপন্থী ও বলসোনারো-সমর্থক ডানপন্থী বলয়ে স্পষ্টভাবে বিভক্ত। এমন এক পরিস্থিতিতে লুলা তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে প্রধান পুঁজি করে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা বর্তমান প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ত্রুটিগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে মাঠে নেমেছেন।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তার নতুন অধ্যায়: মরক্কোর ক্লাবের ডাগআউটে বিশ্ব ফুটবলের রূপকার

চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্রাজিলের প্রবীণ নেতা লুলা দা সিলভা

Update Time : ০৬:০৪:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র ব্রাজিলে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আসন্ন অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে লড়াই করার ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। সাও পাওলোতে ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) এক বিশাল সমাবেশে ৮০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নেতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যদি এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হন, তবে সেটিই হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ মেয়াদ।

এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রচলিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির চেয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের কঠোর বিরোধিতাকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে বেছে নিয়েছেন লুলা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি তাঁর একটি সুচিন্তিত কৌশল। সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া জ্বালাময়ী ভাষণে ব্রাজিলের প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও বিরল খনিজগুলোর ওপর বিদেশি একাধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন।

লুলা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্স—বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তি হোক না কেন, ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলে দেশের খনিজ সম্পদ আহরণের কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মাঝেই এমন মন্তব্য করলেন ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট। গত জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করে, যার পেছনে অন্যায্য বাণিজ্যনীতির অভিযোগ তোলা হয়। যদিও ব্রাসিলিয়া সেই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ব্রাজিলের দক্ষিণপন্থী বলসোনারো পরিবারের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো নির্বাচনী ফল উল্টানোর ষড়যন্ত্র মামলায় দণ্ডিত হয়ে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকায়, তাঁর বড় ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো এবার ডানপন্থী শিবিরের প্রধান মুখ হিসেবে লুলার বিরুদ্ধে লড়ছেন।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লুলা তাঁর সরকারের বিগত মেয়াদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বেকারত্ব হ্রাস এবং দারিদ্র্য বিমোচনে নেওয়া বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির সাফল্যকে সামনে নিয়ে আসছেন। তাঁর দাবি, এসব জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপের ফলে লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের সামনেও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং দেশের কিছু অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কারণে অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভোটারদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এমনকি দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের শীর্ষ নেতাদের ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও নির্বাচনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। ডেটাফোলহার সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলা ৪৮ শতাংশ এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেতে পারেন। দেশবাসীর একটি বড় অংশ এখনো বামপন্থী ও বলসোনারো-সমর্থক ডানপন্থী বলয়ে স্পষ্টভাবে বিভক্ত। এমন এক পরিস্থিতিতে লুলা তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে প্রধান পুঁজি করে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা বর্তমান প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ত্রুটিগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে মাঠে নেমেছেন।