রাজশাহীসহ পুরো উত্তরাঞ্চলকে দেশের পরবর্তী শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপকভিত্তিক নীতিগত সংস্কার ও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের বিনিয়োগ খাতের দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতাগুলো ইতিমধ্যেই সফলভাবে দূর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, রাষ্ট্র এখন কেবল পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে; ব্যবসার মূল ক্ষেত্র প্রস্তুত করার পর স্থানীয় ও জাতীয় উদ্যোক্তাদেরই উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
মঙ্গলবার রাজশাহী প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ক এক আঞ্চলিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন অর্থ উপদেষ্টা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং সুইসকন্ট্যাক্টের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পায়নের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সংকটের চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শুধুমাত্র পুনরুদ্ধার নয়, বরং কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠন করে একটি টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করছে প্রশাসন।
সরকারের সার্বিক উন্নয়ন দর্শনের মূল ভিত্তি হলো সাম্য ও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন। বিগত দিনে দেশের যে অঞ্চলগুলো তুলনামূলকভাবে অবহেলিত বা পিছিয়ে ছিল, সেগুলোকে মূলধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার। এই মহা-লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল, অনুমানযোগ্য এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজ নিরলসভাবে চলছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথ উন্মুক্ত করতে বাজেটে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গাটিকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার প্রধানত পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে ব্যবসায়ীরা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করতে ব্যাপক ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স প্রাপ্তি থেকে শুরু করে কারখানা চালুর পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনলাইন ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে, যাতে উদ্যোক্তাদের কোনো ধরনের অযাচিত হয়রানির মুখোমুখি হতে না হয়। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজাতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে পুনর্গঠন করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচির পাশাপাশি সিএমএসএমই খাতের জন্য বিশেষ তহবিলও চালু রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বিশেষ কিছু রূপরেখা তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা। এই অঞ্চলে কৃষি হাব গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তিন হাজার কোটি টাকা বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে অনেক সময় তৃণমূলের উদ্যোক্তারা এসব সুযোগ-সুবিধার সঠিক তথ্য সময়মতো পান না, সে কারণে চেম্বার ও স্থানীয় বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের এনবিআর অফিসে দৌড়ঝাঁপ কমায়ে ঘরে বসেই সব সেবা পাওয়ার সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার এই যুগে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি খাতের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়ে ড. তিতুমীর উল্লেখ করেন যে, রাজশাহীতে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান থাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ভবন ও কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করে স্বল্প খরচে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। এছাড়া, উত্তরাঞ্চলের পণ্য দ্রুততম সময়ে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরে পৌঁছানোর লক্ষে রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন ও ডুয়েল গেজ লাইন চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আলু, ভুট্টা, আম, লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বহুমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এপিআই শিল্প, দুগ্ধভিত্তিক শিল্প ও নুড়ি-পাথরভিত্তিক নতুন শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
Reporter Name 


















