Dhaka ১২:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ: বাস্তবতা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সমীকরণ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৩৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাস-সংকট নিরসনে সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ের সাথে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বৈঠকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী বলে মন্তব্য করছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘ ৯ বছরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। এই ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের বিপুল গ্যাস মজুত বাংলাদেশকে আকৃষ্ট করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, মিয়ানমারে প্রায় ২২ লাখ কোটি ঘনফুট প্রমাণিত গ্যাসের মজুত রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, পশ্চিমা বিনিয়োগের অভাব এবং উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা এই উৎস ব্যবহারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে এ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন স্থাপন ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান গণহত্যার মামলার মতো বিষয়গুলো এই দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৭ ও ২০০৫ সালের দিকেও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা মূলত ব্যর্থ হয়। বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভিন্ন ও জটিল। যদি পাইপলাইনের বদলে এলএনজি আমদানির বিকল্প পথ খোঁজা হয়, সেক্ষেত্রেও অবকাঠামো নির্মাণ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাশাপাশি মিয়ানমার তাদের উৎপাদিত গ্যাসের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে চীন ও থাইল্যান্ডের কাছে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি করে। তাই নতুন করে বাংলাদেশকে গ্যাস প্রদানের সক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

সর্বোপরি, মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির চিন্তাটি তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তবায়নের জন্য একটি গভীর ও নিরপেক্ষ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। গ্যাসের মূল্য, প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, পাইপলাইনের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু বিবেচনা না করে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভূ-তত্ত্ববিদ বদরুল ইমামের মতে, মিয়ানমারে গ্যাসের মজুত থাকলেও আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা, পাইপলাইনের ব্যয়-সাশ্রয়ী পথ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই সরকারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

নিখোঁজ মানুষের প্রতীক্ষায় এক মানবিক দলিল: নোয়াখালী বন্ধুসভার পাঠচক্রে হুমায়ূন আহমেদের ‘অপেক্ষা’

মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ: বাস্তবতা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সমীকরণ

Update Time : ১১:৩৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাস-সংকট নিরসনে সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ের সাথে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বৈঠকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী বলে মন্তব্য করছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘ ৯ বছরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। এই ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের বিপুল গ্যাস মজুত বাংলাদেশকে আকৃষ্ট করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, মিয়ানমারে প্রায় ২২ লাখ কোটি ঘনফুট প্রমাণিত গ্যাসের মজুত রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, পশ্চিমা বিনিয়োগের অভাব এবং উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা এই উৎস ব্যবহারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে এ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন স্থাপন ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান গণহত্যার মামলার মতো বিষয়গুলো এই দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৭ ও ২০০৫ সালের দিকেও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা মূলত ব্যর্থ হয়। বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভিন্ন ও জটিল। যদি পাইপলাইনের বদলে এলএনজি আমদানির বিকল্প পথ খোঁজা হয়, সেক্ষেত্রেও অবকাঠামো নির্মাণ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাশাপাশি মিয়ানমার তাদের উৎপাদিত গ্যাসের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে চীন ও থাইল্যান্ডের কাছে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি করে। তাই নতুন করে বাংলাদেশকে গ্যাস প্রদানের সক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

সর্বোপরি, মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির চিন্তাটি তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তবায়নের জন্য একটি গভীর ও নিরপেক্ষ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। গ্যাসের মূল্য, প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, পাইপলাইনের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু বিবেচনা না করে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভূ-তত্ত্ববিদ বদরুল ইমামের মতে, মিয়ানমারে গ্যাসের মজুত থাকলেও আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা, পাইপলাইনের ব্যয়-সাশ্রয়ী পথ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই সরকারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।