মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো প্রিয়জনের আকস্মিক হারিয়ে যাওয়া। যে অনিশ্চয়তা আর নীরব যন্ত্রণা নিয়ে পরিবারের মানুষগুলো বেঁচে থাকে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘অপেক্ষা’ উপন্যাসটি মূলত সেই অব্যক্ত বেদনারই এক অসামান্য বয়ান। সম্প্রতি নোয়াখালীর আহমাদিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশেষ পাঠচক্রে এই উপন্যাসটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আয়োজন করে নোয়াখালী বন্ধুসভা। অনুষ্ঠানে উপন্যাসের মানবিক আবেদন ও জীবনবোধের নানা দিক উন্মোচিত হয়।
উপন্যাসটির কাহিনী গড়ে উঠেছে সুরাইয়া নামের এক নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে, যার স্বামী হাসানুজ্জামান অফিস থেকে ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। এই গল্পের মূল শক্তি হলো সুরাইয়ার সেই অন্তহীন প্রতীক্ষা, যা তাকে বাস্তব জগত থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পাঠচক্রে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত নিপুণভাবে একজন নারীর মানসিক টানাপোড়েন এবং প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। হাসানুজ্জামানের নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি চরিত্র নয়, বরং এটি নিখোঁজ হওয়া অসংখ্য মানুষের পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে নোয়াখালী বন্ধুসভার কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা মাধবী বলেন, লেখকের লেখনীর শৈলী পাঠককে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এছাড়া অর্থসম্পাদক সাহিদুল ইসলাম উপন্যাসের পার্শ্ব চরিত্রগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিশেষ করে সুরাইয়ার ভাই জামিলুর রহমানের পরিবারের চিত্রায়ণকে তিনি সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে অভিভাবকদের উদাসীনতা সন্তানদের বিপথে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উপদেষ্টা লায়লা পারভীন হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী সৃষ্টি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবেদন অটুট। তিনি দর্শকদের সেই পুরোনো স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেন, যখন ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। এটিই একজন লেখকের প্রকৃত সার্থকতা, যেখানে চরিত্ররা মানুষের বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
পরিশেষে, সভাপতি আসিফ আহমেদের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই পাঠচক্রে উপন্যাসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব দিক নিয়েই গঠনমূলক আলোচনা হয়। সুরাইয়ার ছেলে ইমন ও মিতুর কিশলয় প্রেমের খুনসুটি থেকে শুরু করে উপন্যাসের রহস্যময় সমাপ্তি—সবকিছুই তরুণ পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। সাহিত্য আলোচনার এই নিয়মিত আয়োজন তরুণ প্রজন্মের মাঝে সৃজনশীলতা ও বই পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উপস্থিত সদস্যরা অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটিতে বন্ধুসভার অন্যান্য সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
Reporter Name 




















