Dhaka ০১:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে সহিষ্ণুতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই সরকারের প্রধান কর্তব্য: জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যায়ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৫:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ Time View

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দুঃশাসন, দমন-পীড়ন এবং নির্বিচার হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত এক তীব্র গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ নতুন এক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়। এই পটভূমিতে বিভিন্ন পক্ষের ধারাবাহিক আলোচনার মধ্য দিয়ে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এই সরকার দেশের কাঠামোগত এবং মৌলিক পরিবর্তন আনবে। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গতানুগতিক চিন্তা ও চর্চার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রকে আমূল বদলে দেওয়ার মতো নজির স্থাপন করা এই প্রশাসনের পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং ভাবমূর্তিকে অনেকেই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ নতুন আশার আলো দেখলেও, সরকার গঠনের মুহূর্ত থেকেই ‘জুলাইয়ের স্বপ্ন’ বড় ধরনের ধাক্কা খায়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং অভিযোগ নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে অসহিষ্ণুতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পতিত স্বৈরাচারের দোসররাও নানাভাবে এই অস্থিরতাকে উসকে দেয়, যার ফলে নতুন প্রশাসনকে প্রথম দিন থেকেই বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ভঙ্গুর আমলাতন্ত্র ও স্থবির নির্বাহী বিভাগ নিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্লোগান ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণ ও অসহিষ্ণুতা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। রাস্তাঘাটে প্রান্তিক মানুষ, নারী, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘ সময় উপেক্ষিত থাকার দাবিদার বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠী মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিনের বাইনারি বা মেরুকরণের রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জুলাইয়ের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান রাজনীতিতে বিভাজন ও বৈরিতা দূর করার যে ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল, ডান ও বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা এবং অসহিষ্ণুতার কারণে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বামপন্থী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা এবং একে অপরকে নির্মূল করার প্রবণতা সমাজকে আরও বেশি মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়।

বর্তমানে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। জনগণের মূল লক্ষ্য এখন সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয়করণের যে পুরোনো সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। দলীয়করণের জেরে যোগ্য প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং সিন্ডিকেট ও চাটুকাররা সুবিধা লাভ করে। জনগণ দেখছে যে, সরকার মুখে সংস্কার ও জুলাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা জনমনে হতাশার সৃষ্টি করছে। প্রতিশোধের রাজনীতি এবং মব জাস্টিসের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের আচরণে সহিষ্ণুতার বার্তা মিললেও, মধ্য ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে পুরোনো দলীয় সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রয়েছে, যা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডান ও বাম কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মভিত্তিক এই চিরচেনা বিভাজন দেশের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর অর্জিত এই রাজনৈতিক মুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে নিয়ে চলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই বিভাজন ঘুচিয়ে মধ্যপন্থার রাজনীতির প্রশস্ত পরিসর তৈরি করতে হবে। এ দেশের সাধারণ মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিতে বসবাস করতে চায়, একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে চায়। তাই সব দল ও মতের মানুষকে আস্থায় নিয়ে সমাজে সহিষ্ণুতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের এবং সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ও পবিত্র কর্তব্য হওয়া উচিত।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

আইন প্রণয়ন কি আমলাতন্ত্রের দখলে? সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক

বাংলাদেশে সহিষ্ণুতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই সরকারের প্রধান কর্তব্য: জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যায়ন

Update Time : ১২:০৫:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দুঃশাসন, দমন-পীড়ন এবং নির্বিচার হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত এক তীব্র গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ নতুন এক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়। এই পটভূমিতে বিভিন্ন পক্ষের ধারাবাহিক আলোচনার মধ্য দিয়ে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এই সরকার দেশের কাঠামোগত এবং মৌলিক পরিবর্তন আনবে। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গতানুগতিক চিন্তা ও চর্চার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রকে আমূল বদলে দেওয়ার মতো নজির স্থাপন করা এই প্রশাসনের পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং ভাবমূর্তিকে অনেকেই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ নতুন আশার আলো দেখলেও, সরকার গঠনের মুহূর্ত থেকেই ‘জুলাইয়ের স্বপ্ন’ বড় ধরনের ধাক্কা খায়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং অভিযোগ নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে অসহিষ্ণুতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পতিত স্বৈরাচারের দোসররাও নানাভাবে এই অস্থিরতাকে উসকে দেয়, যার ফলে নতুন প্রশাসনকে প্রথম দিন থেকেই বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ভঙ্গুর আমলাতন্ত্র ও স্থবির নির্বাহী বিভাগ নিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্লোগান ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণ ও অসহিষ্ণুতা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। রাস্তাঘাটে প্রান্তিক মানুষ, নারী, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘ সময় উপেক্ষিত থাকার দাবিদার বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠী মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিনের বাইনারি বা মেরুকরণের রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জুলাইয়ের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান রাজনীতিতে বিভাজন ও বৈরিতা দূর করার যে ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল, ডান ও বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা এবং অসহিষ্ণুতার কারণে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বামপন্থী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা এবং একে অপরকে নির্মূল করার প্রবণতা সমাজকে আরও বেশি মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়।

বর্তমানে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। জনগণের মূল লক্ষ্য এখন সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয়করণের যে পুরোনো সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। দলীয়করণের জেরে যোগ্য প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং সিন্ডিকেট ও চাটুকাররা সুবিধা লাভ করে। জনগণ দেখছে যে, সরকার মুখে সংস্কার ও জুলাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা জনমনে হতাশার সৃষ্টি করছে। প্রতিশোধের রাজনীতি এবং মব জাস্টিসের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের আচরণে সহিষ্ণুতার বার্তা মিললেও, মধ্য ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে পুরোনো দলীয় সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রয়েছে, যা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডান ও বাম কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মভিত্তিক এই চিরচেনা বিভাজন দেশের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর অর্জিত এই রাজনৈতিক মুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে নিয়ে চলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই বিভাজন ঘুচিয়ে মধ্যপন্থার রাজনীতির প্রশস্ত পরিসর তৈরি করতে হবে। এ দেশের সাধারণ মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিতে বসবাস করতে চায়, একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে চায়। তাই সব দল ও মতের মানুষকে আস্থায় নিয়ে সমাজে সহিষ্ণুতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের এবং সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ও পবিত্র কর্তব্য হওয়া উচিত।