বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি এবং মরমি সাধনার ইতিহাসে যে কটি নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে, তাদের মধ্যে গীতিকবি ও লোককবি জালাল উদ্দিন খাঁ অন্যতম। প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে থেকে মানুষের মুখের ভাষা ও সুরকে সম্বল করে তিনি এমন কিছু সৃষ্টি রেখে গেছেন, যা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে ষাট দশক পর্যন্ত নেত্রকোনার গ্রামীণ জনপদে তাঁর অবাধ বিচরণ লোকসংগীতের ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। তাঁর গানে যেমন ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের নিখাদ চিত্র, তেমনি রয়েছে আত্মোপলব্ধি, সমাজ সচেতনতা এবং মানবমুক্তির গভীর দর্শন।
১৮৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আসদহাটি গ্রামের সিংহগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া এই গুণী সাধক জীবনভর মানুষের অন্তরের সত্যকে খুঁজেছেন। তাঁর পিতা সদরুদ্দীন খাঁর প্রভাবে এবং গ্রামীণ পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর মানসগঠন হয়েছিল। জালাল উদ্দিন খাঁর গানের প্রধান বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে এর বিষয়বস্তুর বিন্যাসে। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে মূলত ছয়টি ধারায় ভাগ করেছিলেন—আত্মতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, লোকতত্ত্ব, দেশতত্ত্ব এবং বিরহতত্ত্ব। তবে তত্ত্বের গণ্ডিতেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ভাটিয়ালি, বাউল, মুর্শিদি ও মারফতির পাশাপাশি ঝাপতাল, চৌপদি কিংবা খেমটার মতো নানা সুরের বৈচিত্র্যে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জালাল উদ্দিন খাঁ প্রায় এক হাজার গান রচনা করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় চার খণ্ডে প্রকাশিত ‘জালাল-গীতিকা’ গ্রন্থে ৬৩০টি গান স্থান পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রয়াণের পর আরও ৭২টি গান যুক্ত করে ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘জালাল-গীতিকা সমগ্র’, যাতে মোট ৭০২টি গান সংকলিত রয়েছে। এই সমগ্র কেবল কিছু সুর বা পঙ্ক্তির সমষ্টি নয়; বরং এটি বাংলার লৌকিক দর্শন, সমাজচিন্তা ও মানবতাবাদের এক অনন্য দলিল। তাঁর গানে ধর্মীয় বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং নৈতিকতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সমাজজীবনের ভণ্ডামি, লোভ এবং অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট ভাষায় কলম ধরেছেন।
অর্থলোভ এবং আত্মিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার পঙ্ক্তিগুলো আজও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে আয়না হিসেবে কাজ করে। ধর্মের মোড়কে যারা স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত, তাদের অসঙ্গতি তিনি সাহসিকতার সাথে গানে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আঘাত করা নয়, বরং সমাজকে সচেতন করা এবং আত্মশুদ্ধির তাগিদ দেওয়াই ছিল তাঁর রচনার মূল লক্ষ্য। লোককবি হিসেবে শুধু গান রচিয়তাতেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না; মালজোড়ার আসরে তাৎক্ষণিক কাব্য রচনা এবং যুক্তিগ্রাহ্য উপস্থাপনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর এই প্রতিভা গ্রামীণ মেলা, হাট-বাজার এবং সাধুসঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের লোকসংগীত গবেষকদের গভীর গবেষণার খোরাক জোগাচ্ছ।
১৯৭২ সালের ৩১ জুলাই এই মহান মরমি সাধক না ফেরার দেশে চলে যান। নিজ বাড়ির আঙিনায় চিরনিদ্রায় শায়িত থাকা এই কবির স্মরণে প্রতিবছর নেত্রকোনায় দুই দিনব্যাপী লোকমেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে সংস্কৃতিমনা মানুষ ও গবেষকরা ভিড় জমান। জালাল উদ্দিন খাঁর জীবনাবসান ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া গান ও দর্শন আজও বাংলার মাটি ও মানুষের আত্মিক পরিচয়ের প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের নানা সংকট মোকাবিলায় তাঁর গান আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং অন্তরের সত্যকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়।
Reporter Name 






















