Dhaka ০১:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন: রাজনৈতিক বিভাজন নিরসনে এক অনিবার্য উদ্যোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

বাংলাদেশের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত সমাজে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জটিল ও শ্রমসাধ্য একটি কাজ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল একটি কমিশন গঠন করলেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণা বা বিভেদ মুছে যাবে না; বরং এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সহনশীলতার চর্চা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। রিকনসিলিয়েশন মানেই প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ার অবসান নয়, বরং এটি আইনি কাঠামোর একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সহিংসতা-পরবর্তী সমাজে টেকসই শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সিয়েরা লিওন, রুয়ান্ডা, তিউনিসিয়া এবং কেনিয়ার মতো দেশগুলোতে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনগুলো ক্রান্তিকালীন সময়ে সফলভাবে কাজ করেছে। তিউনিসিয়ার ট্রুথ অ্যান্ড ডিগনিটি কমিশন বা কেনিয়ার বিচার বিভাগীয় ভেটিং বোর্ড—উভয়ই প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা কত জরুরি। বাংলাদেশেও বর্তমানে জুলাই অভ্যুত্থানের মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পেশাজীবী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে। একদিকে বিচার প্রত্যাশা, অন্যদিকে মৌলিক অধিকার রক্ষা—এই উভয়সংকট থেকে উত্তরণে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে এই প্রক্রিয়ার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। কেবল বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের হিসাব কষলেই কি বাংলাদেশের বিভাজিত সমাজের ক্ষত শুকাবে? ১৯৪৭ বা ১৯৭১-এর দেশভাগ ও স্বাধীনতার সময় থেকে চলে আসা মতাদর্শিক বিভাজন আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রকট। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড, ৮১-র সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা—প্রতিটি ঘটনাই একটি অলিখিত আখ্যানের জন্ম দিয়েছে। এক একটি ঘটনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ বিজয়ী বা পরাজিত হওয়ার বয়ান তৈরি করেছে, যা জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধা।

প্রকৃতপক্ষে, পুনর্মিলন প্রক্রিয়া তখনই সফল হবে যখন তা একাত্তরের অমীমাংসিত অধ্যায় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমস্ত রাজনৈতিক সহিংসতার একটি নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান করবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা এবং সেগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনমূলক পরিকল্পনা ও সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কেবল আইনি বিচার নয়, বরং সামাজিক ক্ষত নিরাময়ের পথ প্রশস্ত করাই হোক আগামী দিনের লক্ষ্য।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো’: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ শাকিলের বেঁচে ফেরার গল্প

বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন: রাজনৈতিক বিভাজন নিরসনে এক অনিবার্য উদ্যোগ

Update Time : ১১:০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত সমাজে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জটিল ও শ্রমসাধ্য একটি কাজ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল একটি কমিশন গঠন করলেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণা বা বিভেদ মুছে যাবে না; বরং এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সহনশীলতার চর্চা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। রিকনসিলিয়েশন মানেই প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ার অবসান নয়, বরং এটি আইনি কাঠামোর একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সহিংসতা-পরবর্তী সমাজে টেকসই শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সিয়েরা লিওন, রুয়ান্ডা, তিউনিসিয়া এবং কেনিয়ার মতো দেশগুলোতে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনগুলো ক্রান্তিকালীন সময়ে সফলভাবে কাজ করেছে। তিউনিসিয়ার ট্রুথ অ্যান্ড ডিগনিটি কমিশন বা কেনিয়ার বিচার বিভাগীয় ভেটিং বোর্ড—উভয়ই প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা কত জরুরি। বাংলাদেশেও বর্তমানে জুলাই অভ্যুত্থানের মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পেশাজীবী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে। একদিকে বিচার প্রত্যাশা, অন্যদিকে মৌলিক অধিকার রক্ষা—এই উভয়সংকট থেকে উত্তরণে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে এই প্রক্রিয়ার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। কেবল বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের হিসাব কষলেই কি বাংলাদেশের বিভাজিত সমাজের ক্ষত শুকাবে? ১৯৪৭ বা ১৯৭১-এর দেশভাগ ও স্বাধীনতার সময় থেকে চলে আসা মতাদর্শিক বিভাজন আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রকট। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড, ৮১-র সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা—প্রতিটি ঘটনাই একটি অলিখিত আখ্যানের জন্ম দিয়েছে। এক একটি ঘটনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ বিজয়ী বা পরাজিত হওয়ার বয়ান তৈরি করেছে, যা জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধা।

প্রকৃতপক্ষে, পুনর্মিলন প্রক্রিয়া তখনই সফল হবে যখন তা একাত্তরের অমীমাংসিত অধ্যায় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমস্ত রাজনৈতিক সহিংসতার একটি নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান করবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা এবং সেগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনমূলক পরিকল্পনা ও সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কেবল আইনি বিচার নয়, বরং সামাজিক ক্ষত নিরাময়ের পথ প্রশস্ত করাই হোক আগামী দিনের লক্ষ্য।