Dhaka ০৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালের বাকেরগঞ্জে চিপসের প্যাকেটের আড়ালে শক্তিশালী ‘বুবি ট্র্যাপ’ বিস্ফোরণ, শিশুসহ দগ্ধ ৩

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:০৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ Time View

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় চিপসের প্যাকেটের আড়ালে পেতে রাখা একটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বিস্ফোরণের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘বুবি ট্র্যাপ’ বা বিস্ফোরণ ফাঁদ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। গত সোমবার সকালে উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামে মৃত শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একই পরিবারের তিনজন মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন শাহ আলমের স্ত্রী হনুফা বেগম (৫৫), মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) এবং নাতি ফাহিম (১৫)। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে আঘাতের তীব্রতা ও অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা থেকে বিশেষ পুলিশি দল ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকালের দিকে উঠানে একটি সুতার সঙ্গে বাঁধা লাল রঙের তিনটি চিপসের প্যাকেট ও একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগ দেখতে পান ইতি আক্তার। কৌতূহলবশত সেটির কাছে গিয়ে নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করলে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণটি ঘটে। বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পরীক্ষায় এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটি সাধারণ কোনো ককটেল বা হাতবোমা ছিল না; বরং এতে ইলেকট্রনিক সার্কিট এবং পেট্রল ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ধরনের ফাঁদ সাধারণত অত্যন্ত সুক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং বিস্ফোরক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছাড়া প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বা লোভনীয় বস্তুর আড়ালে বিস্ফোরক লুকিয়ে রেখে তা স্পর্শ করানোর কৌশলই হলো বুবি ট্র্যাপ। এই ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং পুলিশ পুরো বাড়িটি ঘিরে রেখে পাহারা দিচ্ছে।

এই ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা উদঘাটনে ত্রিমুখী তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। বরিশালের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, মূলত তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় কারও দীর্ঘমেয়াদি কোনো জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে কি না; দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনকভাবে বোমা বা বিস্ফোরক পেতে রাখার ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না; এবং তৃতীয়ত, জাতীয় বা রাজনৈতিক কোনো স্পর্শকাতর সময়কে সামনে রেখে বা নাশকতা সৃষ্টির কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এটি ঘটানো হয়েছে কি না। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের শক্তিশালী আইইডি উদ্ধারের কোনো রেকর্ড না থাকায় ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এদিকে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির দিনমজুর সদস্যরা এই আকস্মিক বিপদে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দগ্ধ নারী ও কিশোরের স্বজনেরা জানিয়েছেন, তাঁদের উপার্জনের কোনো স্থায়ী উৎস নেই এবং ঢাকায় চিকিৎসাধীন স্বজনদের ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও সংসার চালানো নিয়ে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এদিকে বাকেরগঞ্জ থানায় ইতিমধ্যে বিস্ফোরক আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ফরেনসিক ল্যাব থেকে পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর বিস্ফোরকের সঠিক প্রকৃতি ও উপাদানের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি এই নাশকতামূলক ফাঁদ তৈরির নেপথ্যে কোনো সুসংগঠিত চক্র বা অপরাধী গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

কাজাখস্তানের আস্তানায় আন্তর্জাতিক এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের চার তরুণের পদার্পণ

বরিশালের বাকেরগঞ্জে চিপসের প্যাকেটের আড়ালে শক্তিশালী ‘বুবি ট্র্যাপ’ বিস্ফোরণ, শিশুসহ দগ্ধ ৩

Update Time : ০৭:০৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় চিপসের প্যাকেটের আড়ালে পেতে রাখা একটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বিস্ফোরণের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘বুবি ট্র্যাপ’ বা বিস্ফোরণ ফাঁদ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। গত সোমবার সকালে উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামে মৃত শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একই পরিবারের তিনজন মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন শাহ আলমের স্ত্রী হনুফা বেগম (৫৫), মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) এবং নাতি ফাহিম (১৫)। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে আঘাতের তীব্রতা ও অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা থেকে বিশেষ পুলিশি দল ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকালের দিকে উঠানে একটি সুতার সঙ্গে বাঁধা লাল রঙের তিনটি চিপসের প্যাকেট ও একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগ দেখতে পান ইতি আক্তার। কৌতূহলবশত সেটির কাছে গিয়ে নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করলে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণটি ঘটে। বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পরীক্ষায় এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটি সাধারণ কোনো ককটেল বা হাতবোমা ছিল না; বরং এতে ইলেকট্রনিক সার্কিট এবং পেট্রল ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ধরনের ফাঁদ সাধারণত অত্যন্ত সুক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং বিস্ফোরক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছাড়া প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বা লোভনীয় বস্তুর আড়ালে বিস্ফোরক লুকিয়ে রেখে তা স্পর্শ করানোর কৌশলই হলো বুবি ট্র্যাপ। এই ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং পুলিশ পুরো বাড়িটি ঘিরে রেখে পাহারা দিচ্ছে।

এই ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা উদঘাটনে ত্রিমুখী তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। বরিশালের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, মূলত তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় কারও দীর্ঘমেয়াদি কোনো জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে কি না; দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনকভাবে বোমা বা বিস্ফোরক পেতে রাখার ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না; এবং তৃতীয়ত, জাতীয় বা রাজনৈতিক কোনো স্পর্শকাতর সময়কে সামনে রেখে বা নাশকতা সৃষ্টির কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এটি ঘটানো হয়েছে কি না। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের শক্তিশালী আইইডি উদ্ধারের কোনো রেকর্ড না থাকায় ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এদিকে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির দিনমজুর সদস্যরা এই আকস্মিক বিপদে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দগ্ধ নারী ও কিশোরের স্বজনেরা জানিয়েছেন, তাঁদের উপার্জনের কোনো স্থায়ী উৎস নেই এবং ঢাকায় চিকিৎসাধীন স্বজনদের ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও সংসার চালানো নিয়ে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এদিকে বাকেরগঞ্জ থানায় ইতিমধ্যে বিস্ফোরক আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ফরেনসিক ল্যাব থেকে পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর বিস্ফোরকের সঠিক প্রকৃতি ও উপাদানের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি এই নাশকতামূলক ফাঁদ তৈরির নেপথ্যে কোনো সুসংগঠিত চক্র বা অপরাধী গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।