আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থায় সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির অত্যন্ত বিতর্কিত একটি মেগা পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পর মরক্কোর রাজধানী রাবাতে আজ বুধবার সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ইনফান্তিনো। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার মসনদে নিজের অবস্থান ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠা ইনফান্তিনো বর্তমানে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে নানা ধরনের কূটনৈতিক ও পর্দার আড়ালে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরের মার্চে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ ও অনুগত কর্মকর্তারা ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তাঁরা যেকোনো মূল্যে বর্তমান সভাপতির পক্ষে সমর্থন আদায়ে প্রবল চাপ সৃষ্টি করছেন। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলের বড় একটা অংশের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন ইনফান্তিনো। এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র দেশ প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এমনকি ইনফান্তিনোর দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র ও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবও বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সমর্থনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে, যা ফিফা সভাপতির জন্য বড় এক কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ চরম অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনার মধ্যেই জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন ফিফা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও বিস্ফোরক অভিযোগ এনে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলেছেন। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও কঠোর বিবৃতিতে প্রিন্স আলী অভিযোগ করেন যে, ইনফান্তিনোর আসন্ন পুনর্নির্বাচনে যদি জর্ডান সমর্থন জানায়, তবে বিনিময়ে জর্ডান ফুটবলের দীর্ঘদিনের নানাবিধ আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট নিরসনে ফিফা সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে—সম্প্রতি সমাপ্ত বিশ্বকাপের চলাকালেই তাঁকে এই মর্মে সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়েছিল। জর্ডান ফুটবলপ্রধান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই ধরনের অনৈতিক প্রস্তাব ও আচরণ সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেল’ বা জিম্মি করার শামিল এবং তাঁরা কোনো অবস্থাতেই এই অবৈধ চাপের কাছে মাথা নত করবেন না।
প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ডিসেম্বরে কাতারে অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত ফিফা আরব কাপ টুর্নামেন্টে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করা সত্ত্বেও জর্ডান দলকে তাদের প্রাপ্য আর্থিক পুরস্কারের অর্থ এখনো সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া, সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে জর্ডানের প্রচুর বৈধ টিকিটধারী সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন এবং ভিসা বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার সুবাদে জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যে প্রাইজমানি বা প্রদেয় অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর কর ব্যবস্থার আওতাভুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জর্ডান ফুটবল প্রধানের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্নীতির ও স্বৈরাচারী মনোভাবের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে।
ফিফার অভ্যন্তরীণ উচ্চপর্যায় থেকেও ইনফান্তিনোর ওপর বাড়তে শুরু করেছে নৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ। সংস্থার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্টের প্রধান এবং বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, ইনফান্তিনোর সেই বিতর্কিত বাণিজ্যিক বিনিয়োগ পরিকল্পনাটি সময়মতো বাতিল করা অত্যন্ত জরুরি ও অবশ্যম্ভাবী ছিল। অথচ এই বিশাল আর্থিক ও বাণিজ্যিক তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কিংবা ফুটবলের টেকনিক্যাল বিভাগ আগে থেকেই পুরোপুরি অন্ধকারে ছিলেন। একই সময়ে ফিফার মহাসচিব ম্যাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম সংস্থার সকল কর্মীর উদ্দেশ্যে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ ই-মেইল বার্তায় সাম্প্রতিক সময়কার সমস্ত ঘটনাপ্রবাহকে অত্যন্ত ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন, যা ফিফা প্রশাসনের ভেতরের চরম ভাঙন ও বিশৃঙ্খলার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন উয়েফার অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সদস্য দেশ ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর ওপর থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই তালিকায় ওয়েলস, ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং সার্বিয়ার মতো দেশগুলোর নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে চলমান এই গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছে। বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থায় এই অভূতপূর্ব নেতৃত্ব সংকট আগামী দিনে ফুটবলের বৈশ্বিক কাঠামো এবং এর বাণিজ্যিক নীতিমালায় সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
Reporter Name 





















