Dhaka ০৬:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটে অফিস সহকারী হয়ে চার বছর ধরে এইচএসসির খাতা মূল্যায়ন! শিক্ষাবোর্ডের কারণ দর্শানোর নোটিশ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৩৪:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ Time View

সিলেটের শিবগঞ্জ এলাকার গ্রিনহিল স্টেট কলেজের এক অফিস সহকারী শিক্ষক পরিচয়ে টানা চার বছর ধরে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করে আসার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বৈধ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে এই কাজটি চালিয়ে আসছিলেন জয়ন্ত দত্ত নামের ওই কর্মচারী। চলতি বছর তিনি বাংলা প্রথম পত্রের ৫৫৪ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন। এই গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং এরই মধ্যে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষক হতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে কেবল তাঁর পঠিত ও পাঠদানকৃত বিষয়েই আবেদন করতে হয় এবং কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষক হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রিনহিল স্টেট কলেজের গ্রিনহিল স্টেট কলেজের কর্মী জয়ন্ত দত্ত পাস কোর্সে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০১৯ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি কলেজটিতে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন এবং নিয়মানুযায়ী তাঁর প্রভাষক হওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ বা বৈধতা ছিল না। অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে তিনি প্রভাষক পরিচয়ে অনলাইনে পরীক্ষক পদের জন্য আবেদন করেন এবং কলেজ তা অনুমোদন করে বোর্ডে পাঠায়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু নিয়ম লঙ্ঘনই নয়, বরং একটি ফৌজদারি অপরাধের সমতুল্য। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর শেষ কর্মদিবসে এই অনিয়মের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে ধরা পড়ে এবং গত মঙ্গলবার কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে, যোগ্যতাহীন একজন অফিস সহকারীকে কীভাবে বৈধ পরীক্ষক হিসেবে সুপারিশ করা হলো এবং এর নেপথ্যে কারা জড়িত।

এদিকে এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কলেজ প্রশাসনের ভেতর শুরু হয়েছে দায় চাপানোর পালা। অভিযুক্ত জয়ন্ত দত্ত দাবি করেছেন, কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ প্রশান্ত কুমার সাহার কাছে তাঁর নিয়োগপত্র সংরক্ষিত ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর কারণে এখন আর সেটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মন জানিয়েছেন, শিক্ষকের নিয়োগপত্র তাঁর কাছে নেই, বরং তা কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে। অন্যদিকে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক দিগ্‌বিজয় চক্রবর্তী দাবি করেছেন, এই নথিপত্র তাঁর কাছে নেই, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষই ভালো বলতে পারবেন। খাতা দেখার এই অনলাইন আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক একে অপরকে দুষে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।

শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, দেশের পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা রক্ষা করতে এ ধরনের জালিয়াতি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন। শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেলে গ্রিনহিল স্টেট কলেজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জয়ন্ত দত্ত গত চার বছরে যেসব খাতা মূল্যায়ন করেছেন, সেগুলোর মান ও ফলাফল পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

জুলাই অভ্যুত্থানের তথ্যচিত্র নিয়ে হট্টগোল: সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জন এনসিপি নেতাদের

সিলেটে অফিস সহকারী হয়ে চার বছর ধরে এইচএসসির খাতা মূল্যায়ন! শিক্ষাবোর্ডের কারণ দর্শানোর নোটিশ

Update Time : ০৫:৩৪:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

সিলেটের শিবগঞ্জ এলাকার গ্রিনহিল স্টেট কলেজের এক অফিস সহকারী শিক্ষক পরিচয়ে টানা চার বছর ধরে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করে আসার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বৈধ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে এই কাজটি চালিয়ে আসছিলেন জয়ন্ত দত্ত নামের ওই কর্মচারী। চলতি বছর তিনি বাংলা প্রথম পত্রের ৫৫৪ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন। এই গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং এরই মধ্যে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষক হতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে কেবল তাঁর পঠিত ও পাঠদানকৃত বিষয়েই আবেদন করতে হয় এবং কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষক হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রিনহিল স্টেট কলেজের গ্রিনহিল স্টেট কলেজের কর্মী জয়ন্ত দত্ত পাস কোর্সে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০১৯ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি কলেজটিতে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন এবং নিয়মানুযায়ী তাঁর প্রভাষক হওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ বা বৈধতা ছিল না। অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে তিনি প্রভাষক পরিচয়ে অনলাইনে পরীক্ষক পদের জন্য আবেদন করেন এবং কলেজ তা অনুমোদন করে বোর্ডে পাঠায়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু নিয়ম লঙ্ঘনই নয়, বরং একটি ফৌজদারি অপরাধের সমতুল্য। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর শেষ কর্মদিবসে এই অনিয়মের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে ধরা পড়ে এবং গত মঙ্গলবার কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে, যোগ্যতাহীন একজন অফিস সহকারীকে কীভাবে বৈধ পরীক্ষক হিসেবে সুপারিশ করা হলো এবং এর নেপথ্যে কারা জড়িত।

এদিকে এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কলেজ প্রশাসনের ভেতর শুরু হয়েছে দায় চাপানোর পালা। অভিযুক্ত জয়ন্ত দত্ত দাবি করেছেন, কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ প্রশান্ত কুমার সাহার কাছে তাঁর নিয়োগপত্র সংরক্ষিত ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর কারণে এখন আর সেটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মন জানিয়েছেন, শিক্ষকের নিয়োগপত্র তাঁর কাছে নেই, বরং তা কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে। অন্যদিকে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক দিগ্‌বিজয় চক্রবর্তী দাবি করেছেন, এই নথিপত্র তাঁর কাছে নেই, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষই ভালো বলতে পারবেন। খাতা দেখার এই অনলাইন আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক একে অপরকে দুষে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।

শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, দেশের পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা রক্ষা করতে এ ধরনের জালিয়াতি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন। শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেলে গ্রিনহিল স্টেট কলেজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জয়ন্ত দত্ত গত চার বছরে যেসব খাতা মূল্যায়ন করেছেন, সেগুলোর মান ও ফলাফল পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।