জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চরম হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত একটি তথ্যচিত্র ঘিরে তীব্র অসন্তোষ ও বাক্বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ওই ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা বিকৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারা প্রতিবাদ জানান এবং একপর্যায়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান চলাকালে যখন বিশাল পর্দায় জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসভিত্তিক তথ্যচিত্রটি প্রদর্শন করা হয়, তখনই সেখানে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকারসহ দলের অন্যান্য নেতারা অভিযোগ করেন যে, তথ্যচিত্রে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব, শহীদ আবু সাঈদের মতো প্রতীকী চরিত্র এবং ৯ দফা ও ১ দফা ঘোষণার প্রকৃত প্রেক্ষাপট সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, ১ দফা ঘোষণার মূল কৃতিত্ব ও ইতিহাসকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
তথ্যচিত্রের এই বিতর্কিত উপস্থাপনা নিয়ে দর্শকসারিতে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই অনুষ্ঠানস্থল হট্টগোলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মঞ্চ থেকে উপস্থাপক এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালান। মন্ত্রী আহমেদ আযম খান তথ্যচিত্রে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের আশ্বাস দিলেও স্লোগানে মুখর দর্শকসারির ক্ষোভ থামানো যায়নি। বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাইকের সামনে এসে সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং অসন্তুষ্ট পক্ষকে ডায়াস থেকে বক্তব্য রাখার অনুরোধ করেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করলে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মঞ্চে আসেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে খাটো করে এবং একপেশে ইতিহাস উপস্থাপন করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে কিংবা তাঁর সহযোদ্ধাদের পক্ষে অবস্থান করা অসম্ভব। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নীরবে অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করা হয়েছিল, আজ জুলাইয়ের ইতিহাসেও ঠিক একই রকম একপেশে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে পুরো ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে এমন হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও ব্যথিত হয়েছেন। এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা দেশের বাইরে ভুল বার্তা দেয় এবং এটি কেবল ছাত্র-জনতার বিপ্লবের বিরোধিতাকারীদেরই আনন্দিত করবে। তথ্যচিত্রের বিভিন্ন ত্রুটির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের অবিসংবাদিত প্রতীক শহীদ আবু সাঈদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবদান বাদ দিয়ে কোনো তথ্যচিত্রই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও তাঁর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই অভ্যুত্থান সমগ্র জাতির এবং একে কোনোভাবেই দলীয়করণ করা যাবে না।
Reporter Name 


















