Dhaka ০৭:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর আগে সব সঞ্চয় গৃহকর্মীকে দিয়ে গিয়েছিলেন তেলুগু অভিনেতা রঙ্গনাথ: এক মানবিক অধ্যায়

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

তেলুগু সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা রঙ্গনাথের প্রয়াণ কেবল বিনোদন জগতেই নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক করুণ ও মানবিক গল্প হিসেবে আজও মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন এই প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা, যা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মনে। নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় ও সম্পদ পরিবারের সদস্যদের হাতে না দিয়ে, তিনি তুলে দিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত গৃহকর্মীর হাতে। মৃত্যুর আগে নিজের ঘরের দেয়ালে কালো মার্কার দিয়ে লিখে যান, ‘এটা তাকে দিয়ে দিও। তাকে কষ্ট দিও না।’

চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করা তিরুমালা সুন্দর শ্রী রঙ্গনাথ অভিনয়ে আসার আগে ভারতীয় রেলওয়েতে টিকিট পরীক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৬৯ সালে প্রখ্যাত পরিচালক বাপুর ‘বুদ্ধিমানথুডু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অভিনয়জীবনে তিনি তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন। প্রথমে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেও সময়ের সাথে সাথে খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ‘জমিন্দারুগারি আম্মাই’, ‘আমেরিকা আম্মাই’, ‘পন্থুলাম্মা’, ‘থায়ারাম্মা বঙ্গারাইয়া’, ‘মনমাধুডু’ এবং ‘নিজাম’-এর মতো দর্শকনন্দিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে অম্লান হয়ে আছে।

তবে পেশাগত সফলতার অন্তরালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা টানাপোড়েন ও একাকিত্বে ভরা। ২০০৯ সালে প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি মারাত্মক মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতায় ভুগেছিলেন। তাঁর কন্যা নীরজা গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে, মায়ের মৃত্যুর পর বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং প্রায়ই আত্মহত্যার কথা বলতেন। এমনকি তাঁকে মানসিক কাউন্সেলিংও করানো হয়েছিল। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বরের দুপুরে তাঁর গৃহকর্মী মীনাক্ষী শেষবারের মতো খাবার তৈরি করে তাঁর বাসা থেকে চলে যান। এরপর সন্ধ্যায় তাঁর পরিচিত কিছু মানুষ দেখা করতে এসে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশ শব্দ না পেয়ে পরিবারকে খবর দেন। পরে পুলিশ ও পরিবারের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অভিনেতার মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরা—নীরজা ছাড়াও আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে—বাবার শেষ ইচ্ছাকে পরম শ্রদ্ধায় মেনে নেন। রঙ্গনাথের রেখে যাওয়া সমস্ত সঞ্চয় ও সম্পদ তাঁর দীর্ঘদিনের সেবিকা ও গৃহকর্মী মীনাক্ষীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঘরের দেওয়ালে লিখে যাওয়া সেই ছোট্ট নির্দেশকে সম্মান জানিয়ে তাঁর পরিবার এই মানবিক কাজটি সম্পন্ন করে। একজন জনপ্রিয় তারকার জীবনের মর্মান্তিক পরিণতি হলেও, তাঁর এই অন্তিম ইচ্ছা প্রমাণ করেছিল যে অর্থ-বিত্তের চেয়ে মানুষের প্রতি সহানুভূতি, কৃতজ্ঞতাবোধ ও মানবিকতা অনেক বেশি মূল্যবান। তেলুগু সিনেমার এই ক্ষণজন্মা অভিনেতার শেষ অধ্যায়টি আজও বিনোদন দুনিয়ায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন: শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

মৃত্যুর আগে সব সঞ্চয় গৃহকর্মীকে দিয়ে গিয়েছিলেন তেলুগু অভিনেতা রঙ্গনাথ: এক মানবিক অধ্যায়

Update Time : ০৬:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

তেলুগু সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা রঙ্গনাথের প্রয়াণ কেবল বিনোদন জগতেই নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক করুণ ও মানবিক গল্প হিসেবে আজও মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন এই প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা, যা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মনে। নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় ও সম্পদ পরিবারের সদস্যদের হাতে না দিয়ে, তিনি তুলে দিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত গৃহকর্মীর হাতে। মৃত্যুর আগে নিজের ঘরের দেয়ালে কালো মার্কার দিয়ে লিখে যান, ‘এটা তাকে দিয়ে দিও। তাকে কষ্ট দিও না।’

চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করা তিরুমালা সুন্দর শ্রী রঙ্গনাথ অভিনয়ে আসার আগে ভারতীয় রেলওয়েতে টিকিট পরীক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৬৯ সালে প্রখ্যাত পরিচালক বাপুর ‘বুদ্ধিমানথুডু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অভিনয়জীবনে তিনি তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন। প্রথমে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেও সময়ের সাথে সাথে খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ‘জমিন্দারুগারি আম্মাই’, ‘আমেরিকা আম্মাই’, ‘পন্থুলাম্মা’, ‘থায়ারাম্মা বঙ্গারাইয়া’, ‘মনমাধুডু’ এবং ‘নিজাম’-এর মতো দর্শকনন্দিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে অম্লান হয়ে আছে।

তবে পেশাগত সফলতার অন্তরালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা টানাপোড়েন ও একাকিত্বে ভরা। ২০০৯ সালে প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি মারাত্মক মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতায় ভুগেছিলেন। তাঁর কন্যা নীরজা গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে, মায়ের মৃত্যুর পর বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং প্রায়ই আত্মহত্যার কথা বলতেন। এমনকি তাঁকে মানসিক কাউন্সেলিংও করানো হয়েছিল। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বরের দুপুরে তাঁর গৃহকর্মী মীনাক্ষী শেষবারের মতো খাবার তৈরি করে তাঁর বাসা থেকে চলে যান। এরপর সন্ধ্যায় তাঁর পরিচিত কিছু মানুষ দেখা করতে এসে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশ শব্দ না পেয়ে পরিবারকে খবর দেন। পরে পুলিশ ও পরিবারের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অভিনেতার মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরা—নীরজা ছাড়াও আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে—বাবার শেষ ইচ্ছাকে পরম শ্রদ্ধায় মেনে নেন। রঙ্গনাথের রেখে যাওয়া সমস্ত সঞ্চয় ও সম্পদ তাঁর দীর্ঘদিনের সেবিকা ও গৃহকর্মী মীনাক্ষীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঘরের দেওয়ালে লিখে যাওয়া সেই ছোট্ট নির্দেশকে সম্মান জানিয়ে তাঁর পরিবার এই মানবিক কাজটি সম্পন্ন করে। একজন জনপ্রিয় তারকার জীবনের মর্মান্তিক পরিণতি হলেও, তাঁর এই অন্তিম ইচ্ছা প্রমাণ করেছিল যে অর্থ-বিত্তের চেয়ে মানুষের প্রতি সহানুভূতি, কৃতজ্ঞতাবোধ ও মানবিকতা অনেক বেশি মূল্যবান। তেলুগু সিনেমার এই ক্ষণজন্মা অভিনেতার শেষ অধ্যায়টি আজও বিনোদন দুনিয়ায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।