বিশ্বজুড়ে রক সংগীতে নারীদের সরব উপস্থিতি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও, কয়েক দশক আগের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সে যুগে পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্যের রক মঞ্চে নারী শিল্পীদের প্রবেশাধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং হাতে গোনা কয়েকটি ব্যান্ডের মাঝেই সীমাবদ্ধ। পুরুষতান্ত্রিক সেই অচলায়তন ভেঙে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল ‘দ্য রানঅ্যাওয়েজ’ (The Runaways)। পাঁচজন মাত্র কিশোরীকে নিয়ে গঠিত এই ব্যান্ডটি তাদের অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী ক্যারিয়ারের মাধ্যমেই রক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
ষাটের দশকের ‘গোল্ডি অ্যান্ড দ্য জিঞ্জারব্রেডস’ কিংবা সত্তরের দশকের ‘ফ্যানি’র মতো অগ্রগামী ব্যান্ডগুলো নারীদের জন্য রক মঞ্চে প্রবেশের পথ কিছুটা প্রশস্ত করেছিল বটে, তবে দ্য রানঅ্যাওয়েজের মতো বিশাল সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অভিঘাত সৃষ্টি করতে খুব কম ব্যান্ডই সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী সময়কার জনপ্রিয় নারী রক ব্যান্ড যেমন ‘দ্য ব্যাঙ্গলস’, ‘এল সেভেন’, ‘দ্য গো-গোজ’, ‘দ্য ডোনাস’, ‘সাহারা হটনাইটস’ এবং ‘ভিক্সেন’-এর মতো বহু খ্যাতনামা দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কিংবদন্তি ব্যান্ডটির কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা লাভ করেছিল।
১৯৭৫ সালের দিকে হলিউডের খ্যাতিমান সংগীত উদ্যোক্তা ও প্রযোজক কিম ফাওলি একটি সম্পূর্ণ নারী সদস্যের সমন্বয়ে রক ব্যান্ড গড়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নেন। গীতিকার কারি ক্রোমের সহযোগিতায় তাঁর পরিচয় ঘটে সম্ভাবনাময় তরুণ গিটারিস্ট জোয়ান জেটের সঙ্গে। পরবর্তীতে হলিউডের বিখ্যাত রেইনবো বার অ্যান্ড গ্রিলের পার্কিং লটে তিনি খুঁজে পান প্রতিভাবান ড্রামার স্যান্ডি ওয়েস্টকে। এরপর একে একে অন্যান্য সদস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত গঠিত হয় দ্য রানঅ্যাওয়েজের ঐতিহাসিক লাইনআপ—যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন শেরি কারি, লিটা ফোর্ড, জ্যাকি ফক্স, জোয়ান জেট এবং স্যান্ডি ওয়েস্ট।
অদ্ভুত ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হলেও ব্যান্ডটির অগ্রযাত্রা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুত। ১৯৭৫ সালের শেষভাগের মধ্যেই তারা স্বনামধন্য মারকারি রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং ১৯৭৬ সালে অবমুক্ত করে তাদের আত্মপ্রকাশকারী প্রথম অ্যালবাম ‘দ্য রানঅ্যাওয়েজ’। এই অ্যালবামের প্রথম ট্র্যাক ‘চেরি বম্ব’ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে সংগীত মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অ্যালবামের অন্যান্য গানগুলোর মধ্যে ‘ইউ ড্রাইভ মি ওয়াইল্ড’, ‘রক অ্যান্ড রোল’, ‘ব্ল্যাকমেল’ এবং ‘ডেড এন্ড জাস্টিস’ ছিল সত্তরের দশকের গ্ল্যাম রক, হার্ড রক ও পাওয়ার পপের এক অনন্য মিশ্রণ।
তবে নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রে দ্য রানঅ্যাওয়েজকে প্রায়শই নানা অবমূল্যায়ন ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মার্কিন সমালোচকদের একটি অংশ তাদের কেবল কিশোরীদের খামখেয়ালী ব্যান্ড হিসেবে দেখত, আবার কেউ কেউ তাদের কোনো আসল সংগীতশিল্পী না বলে সাজানো কোনো প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করার অপচেষ্টা চালাতো। কিন্তু দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অভাবনীয় সাফল্যের গল্পে ভরা। বিশেষ করে জাপানে এই ব্যান্ডটি যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তা ছিল ইতিহাস সৃষ্টিকারী। ১৯৭৭ সালে জাপান সফরে গিয়ে তারা সফলভাবে ১০টি কনসার্ট সম্পন্ন করে, যার প্রতিটিতে উপচে পড়েছিল তরুণ ভক্তদের বাঁধভাঙা ভিড়। সেখানে তাদের জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশচুম্বী হয়েছিল যে স্বয়ং জোয়ান জেট সেটিকে বিটলসের ক্রেজের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। জাপানের সেই অভূতপূর্ব সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় তাদের জনপ্রিয় লাইভ অ্যালবাম ‘লাইভ ইন জাপান’ (১৯৭৭)।
অসাধারণ সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি দ্য রানঅ্যাওয়েজের পথচলা কখনোই বিতোনামুক্ত বা মসৃণ ছিল না। প্রযোজক কিম ফাওলির কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ব্যান্ড সদস্যদের অল্প বয়স এবং ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা জটিলতা তাদের চলার পথকে কঠিন করে তোলে। পরবর্তীতে ফাওলির বিরুদ্ধে ব্যান্ডের কয়েকজন সদস্য গুরুতর যৌন অসদাচরণের অভিযোগও উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে জ্যাকি ফক্স ব্যান্ড ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে শেরি কারির বিদায়ের মধ্য দিয়ে জোয়ান জেট ব্যান্ডে আরও বেশি নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে তাদের আরেকটি প্রশংসিত অ্যালবাম ‘ওয়েটিং ফর দ্য নাইট’ প্রকাশিত হয়। এরপর অভ্যন্তরীণ নানা সদস্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার শতচেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৭৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্য রানঅ্যাওয়েজের সুদীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি ঘটে।
ব্যান্ডটি ভেঙে যাওয়ার পরও এর সদস্যরা থেমে থাকেননি; বরং তাদের মধ্য থেকে জন্ম নেয় দুজন বিশ্বখ্যাত কিংবদন্তি। জোয়ান জেট পরবর্তীতে হার্ড রকের অন্যতম জনপ্রিয় নারী একক শিল্পী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর দল ‘জোয়ান জেট অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাকহার্টস’-এর পরিবেশিত ‘আই লাভ রক অ্যান্ড রোল’ গানটি বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অন্যদিকে, লিটা ফোর্ড আশির দশকের অন্যতম সফল নারী মেটাল গিটারিস্ট ও রকতারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ড্রামার স্যান্ডি ওয়েস্টও আমৃত্যু সংগীতের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন এবং অসংখ্য তরুণ শিল্পীর অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন। এছাড়া শেরি কারি পরবর্তীতে অভিনয়েও নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন।
মাত্র কয়েক বছরের সংক্ষিপ্ত একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে ‘দ্য রানঅ্যাওয়েজ’ চিরতরে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে রক সংগীত কেবল পুরুষদের একক কোনো রাজত্ব নয়। তারা যে সাহসী পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন, সেই পথ ধরেই পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারী শিল্পী পরবর্তী সময়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গিটার হাতে মঞ্চে আরোহণ করেছেন এবং বিশ্বসংগীতের মানচিত্র চিরতরে বদলে দিয়েছেন।
Reporter Name 





















