Dhaka ১১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সাহিত্যপত্র ‘শতদল’: হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও বাঙালি সংস্কৃতির সোনালী অতীত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এর আবাসিক হলগুলো থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্যপত্র ও বার্ষিকী। ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাগে এবং পাকিস্তান আমলের প্রারম্ভে এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রই ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তা, সাহিত্যসাধনা এবং বাঙালি সংস্কৃতির এক উর্বর ক্ষেত্র। সেই সোনালী সময়ে ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত ‘শতদল’ বার্ষিকী ছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজের মনন ও দূরদৃষ্টির প্রতীক। পূর্ব বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রকাশিত প্রথম সাহিত্যিক বার্ষিকী হিসেবে ‘শতদল’ এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিল। ১৯২৩ সালে এর যাত্রা শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কেবল ছাত্রজীবনের রোজনামচা বা বার্ষিক প্রতিবেদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং মানসম্মত সাহিত্য পত্রিকায় রূপ নেয়। শতদলের জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, প্রতিবছর হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই পত্রিকার সম্পাদক পদটির জন্য আলাদা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি ও বিভিন্ন দুর্লভ তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, শতদলের বহু ঐতিহাসিক সংখ্যা কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। তবে যে কয়েকটি সংখ্যা এবং প্রবন্ধ সংরক্ষিত আছে, তা থেকে তৎকালীন শিক্ষার্থীদের চিন্তার পরিধি ও সাহিত্যিক মুন্সিয়ানার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৩৭ সালের শতদলের পঞ্চদশ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘শতদলের আদিকথা ও ইতিপর্ব’ নামক প্রবন্ধে এর সূচনার ইতিহাস তুলে ধরা হয়। জানা যায়, ১৩৩০ বঙ্গাব্দে সর্বপ্রথম ‘Lotus’ নামে ইংরেজি ও বাংলায় দ্বিভাষিক রূপ নিয়ে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে হলের তৎকালীন প্রভোস্ট এবং বুদ্ধিজীবীদের দিকনির্দেশনায় এটি সম্পূর্ণ বাংলায় রূপান্তরিত হয় এবং ‘শতদল’ নামকরণ করা হয়। মাতৃভাষার প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা এবং সাহিত্যচর্চায় বিদেশি ভাষার আধিপত্য ভাঙার যে প্রয়াস শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছিলেন, তা তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। শতদলের সাহিত্যিক মান এতটাই উন্নত ছিল যে, এতে শুধু হলের সাধারণ ছাত্ররাই নন, বরং দেশবরেণ্য ও বিশ্বখ্যাত মনীষীরাও লেখালেখি করতেন। ১৯৩৯ সালের সপ্তদশ সংখ্যাটি এ ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। ওই সংখ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উদ্বোধন’ নামের একটি কবিতা এবং তাঁর প্রখ্যাত প্রবন্ধ ‘প্রার্থনার আবশ্যকতা’ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও একই সংখ্যায় প্রগতিশীল চিন্তাবিদ অধ্যাপক মোহিতলাল মজুমদার, কিংবদন্তি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং অর্থনীতিবিদ অমিয় দাসগুপ্তের মতো ক্ষণজন্মা পুরুষদের মূল্যবান লেখা স্থান পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিশেষ লেখাগুলো পরবর্তীতে শতদল ছাড়া আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি, যা এই পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। শতদলের পাতায় কেবল কবিতা বা প্রবন্ধই নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদের কুফল, রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজবিশ্লেষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি এবং রম্যরচনা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিজ্ঞান বিভাগের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা ল্যাবরেটরি ও পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেভাবে সাহিত্য ও দর্শনের বিশাল সমুদ্রে নিজেদের অবগাহন ঘটিয়েছিলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সময়ের পরিবর্তনে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কালক্রমে হারিয়ে গেছে শতদলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনাগুলো। ২০১৯ সালে দায়সারা গোছের একটি সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এর পুনরুজ্জীবনের অসম্পূর্ণ চেষ্টা করা হলেও নিয়মিত প্রকাশনার ধারাটি আজ প্রায় মৃত। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরবময় সাহিত্যিক ঐতিহ্য আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে আজও গভীরভাবে আলোড়িত করে। শতদলের মতো ঐতিহাসিক সাহিত্যপত্রগুলোর বিলুপ্তি কেবল একটি পত্রিকার মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের সৃজনশীলতার ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়ের অবসান। বর্তমান আধুনিক যুগে এসেও শতদলের সেই সুদূর প্রসারী চিন্তা এবং মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষা যে সার্টিফিকেট সর্বস্ব নয়, বরং মননশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ—শতদলের ইতিহাস যেন সেই চিরন্তন সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

বিতর্ক ও তীব্র লড়াইয়ের পর ওটিটি রিয়েলিটি শো ‘লক আপ ২’-এর বিজয়ী শ্রেয়া কালরা, জিতলেন ১ কোটি রুপি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সাহিত্যপত্র ‘শতদল’: হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও বাঙালি সংস্কৃতির সোনালী অতীত

Update Time : ০৯:৩৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এর আবাসিক হলগুলো থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্যপত্র ও বার্ষিকী। ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাগে এবং পাকিস্তান আমলের প্রারম্ভে এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রই ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তা, সাহিত্যসাধনা এবং বাঙালি সংস্কৃতির এক উর্বর ক্ষেত্র। সেই সোনালী সময়ে ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত ‘শতদল’ বার্ষিকী ছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজের মনন ও দূরদৃষ্টির প্রতীক। পূর্ব বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রকাশিত প্রথম সাহিত্যিক বার্ষিকী হিসেবে ‘শতদল’ এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিল। ১৯২৩ সালে এর যাত্রা শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কেবল ছাত্রজীবনের রোজনামচা বা বার্ষিক প্রতিবেদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং মানসম্মত সাহিত্য পত্রিকায় রূপ নেয়। শতদলের জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, প্রতিবছর হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই পত্রিকার সম্পাদক পদটির জন্য আলাদা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি ও বিভিন্ন দুর্লভ তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, শতদলের বহু ঐতিহাসিক সংখ্যা কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। তবে যে কয়েকটি সংখ্যা এবং প্রবন্ধ সংরক্ষিত আছে, তা থেকে তৎকালীন শিক্ষার্থীদের চিন্তার পরিধি ও সাহিত্যিক মুন্সিয়ানার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৩৭ সালের শতদলের পঞ্চদশ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘শতদলের আদিকথা ও ইতিপর্ব’ নামক প্রবন্ধে এর সূচনার ইতিহাস তুলে ধরা হয়। জানা যায়, ১৩৩০ বঙ্গাব্দে সর্বপ্রথম ‘Lotus’ নামে ইংরেজি ও বাংলায় দ্বিভাষিক রূপ নিয়ে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে হলের তৎকালীন প্রভোস্ট এবং বুদ্ধিজীবীদের দিকনির্দেশনায় এটি সম্পূর্ণ বাংলায় রূপান্তরিত হয় এবং ‘শতদল’ নামকরণ করা হয়। মাতৃভাষার প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা এবং সাহিত্যচর্চায় বিদেশি ভাষার আধিপত্য ভাঙার যে প্রয়াস শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছিলেন, তা তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। শতদলের সাহিত্যিক মান এতটাই উন্নত ছিল যে, এতে শুধু হলের সাধারণ ছাত্ররাই নন, বরং দেশবরেণ্য ও বিশ্বখ্যাত মনীষীরাও লেখালেখি করতেন। ১৯৩৯ সালের সপ্তদশ সংখ্যাটি এ ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। ওই সংখ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উদ্বোধন’ নামের একটি কবিতা এবং তাঁর প্রখ্যাত প্রবন্ধ ‘প্রার্থনার আবশ্যকতা’ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও একই সংখ্যায় প্রগতিশীল চিন্তাবিদ অধ্যাপক মোহিতলাল মজুমদার, কিংবদন্তি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং অর্থনীতিবিদ অমিয় দাসগুপ্তের মতো ক্ষণজন্মা পুরুষদের মূল্যবান লেখা স্থান পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিশেষ লেখাগুলো পরবর্তীতে শতদল ছাড়া আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি, যা এই পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। শতদলের পাতায় কেবল কবিতা বা প্রবন্ধই নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদের কুফল, রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজবিশ্লেষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি এবং রম্যরচনা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিজ্ঞান বিভাগের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা ল্যাবরেটরি ও পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেভাবে সাহিত্য ও দর্শনের বিশাল সমুদ্রে নিজেদের অবগাহন ঘটিয়েছিলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সময়ের পরিবর্তনে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কালক্রমে হারিয়ে গেছে শতদলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনাগুলো। ২০১৯ সালে দায়সারা গোছের একটি সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এর পুনরুজ্জীবনের অসম্পূর্ণ চেষ্টা করা হলেও নিয়মিত প্রকাশনার ধারাটি আজ প্রায় মৃত। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরবময় সাহিত্যিক ঐতিহ্য আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে আজও গভীরভাবে আলোড়িত করে। শতদলের মতো ঐতিহাসিক সাহিত্যপত্রগুলোর বিলুপ্তি কেবল একটি পত্রিকার মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের সৃজনশীলতার ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়ের অবসান। বর্তমান আধুনিক যুগে এসেও শতদলের সেই সুদূর প্রসারী চিন্তা এবং মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষা যে সার্টিফিকেট সর্বস্ব নয়, বরং মননশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ—শতদলের ইতিহাস যেন সেই চিরন্তন সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।