Dhaka ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কার্টার থেকে ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যেভাবে ধোঁয়াশায় রেখেছেন ইরানের নেতারা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৩৪:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নিয়ে তেহরানের ভূমিকা বরাবরই এক জটিল ধাঁধা হিসেবে রয়ে গেছে। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসনকাঠামো বুঝতে গিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে হোয়াইট হাউসের প্রতিটি প্রশাসনই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর ব্যতিক্রম নন। সম্প্রতি তেহরানের আচরণে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনীতির টেবিলে ইরান চরম প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। ট্রাম্প নিজেকে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত ও তা দমনের দক্ষ কারিগর মনে করলেও, ইরানের কৌশলগত ও আদর্শিক মারপ্যাঁচ তাঁকে বারবার বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে নিয়ে মার্কিন নীতিতে এই হতাশা নতুন কিছু নয়। গত কয়েক দশকে জিমি কার্টার থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামার মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও তেহরানের ধোঁয়াশাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখে পড়ে হোঁচট খেয়েছেন। ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট নিরসনে ইরানের সঙ্গে গোপন কূটনীতি চালিয়েও চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। একইভাবে, ১৯৮৫ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের আমলেও মধ্যপন্থী ইরানি নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের খোজে চালানো গোপন অস্ত্র বিক্রি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’র জন্ম দেয়, যা মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন বারাক ওবাামা, যিনি ২০১৫ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের উত্তেজনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং বাণিজ্য শুল্ক আদায়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছে। যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন ভোটারদের কাছে এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল তেহরানের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাবে। তবে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কট্টরপন্থী ধারা আরও পোক্ত হয়েছে। মার্কিন নেতার সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব বা পূর্বশর্তগুলো তেহরান পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের হিসাব-নিকাশ ও ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই বারবার ব্যর্থতার মূল কারণ হলো তেহরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে প্রোথিত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারা। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের অনুপস্থিতি এবং দেশটির আধা-গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধর্মীয় কর্তৃত্বের পরিধি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়াই ওয়াশিংটনকে বারবার বিপাকে ফেলছে। প্রবীণ কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, মার্কিন প্রশাসনের চেয়ে ইরানি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের মানসিকতা ও কৌশল অনেক বেশি নিখুঁতভাবে বুঝতে পারে। ফলে দশকের পর দশক ধরে চলা এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কৌশলগত ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসা আগামী দিনেও সহজ হবে না বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠাতা: এক ভিন্নধর্মী সাক্ষাতের পেছনের গল্প

কার্টার থেকে ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যেভাবে ধোঁয়াশায় রেখেছেন ইরানের নেতারা

Update Time : ০৮:৩৪:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নিয়ে তেহরানের ভূমিকা বরাবরই এক জটিল ধাঁধা হিসেবে রয়ে গেছে। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসনকাঠামো বুঝতে গিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে হোয়াইট হাউসের প্রতিটি প্রশাসনই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর ব্যতিক্রম নন। সম্প্রতি তেহরানের আচরণে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনীতির টেবিলে ইরান চরম প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। ট্রাম্প নিজেকে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত ও তা দমনের দক্ষ কারিগর মনে করলেও, ইরানের কৌশলগত ও আদর্শিক মারপ্যাঁচ তাঁকে বারবার বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে নিয়ে মার্কিন নীতিতে এই হতাশা নতুন কিছু নয়। গত কয়েক দশকে জিমি কার্টার থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামার মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও তেহরানের ধোঁয়াশাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখে পড়ে হোঁচট খেয়েছেন। ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট নিরসনে ইরানের সঙ্গে গোপন কূটনীতি চালিয়েও চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। একইভাবে, ১৯৮৫ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের আমলেও মধ্যপন্থী ইরানি নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের খোজে চালানো গোপন অস্ত্র বিক্রি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’র জন্ম দেয়, যা মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন বারাক ওবাামা, যিনি ২০১৫ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের উত্তেজনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং বাণিজ্য শুল্ক আদায়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছে। যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন ভোটারদের কাছে এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল তেহরানের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাবে। তবে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কট্টরপন্থী ধারা আরও পোক্ত হয়েছে। মার্কিন নেতার সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব বা পূর্বশর্তগুলো তেহরান পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের হিসাব-নিকাশ ও ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই বারবার ব্যর্থতার মূল কারণ হলো তেহরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে প্রোথিত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারা। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের অনুপস্থিতি এবং দেশটির আধা-গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধর্মীয় কর্তৃত্বের পরিধি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়াই ওয়াশিংটনকে বারবার বিপাকে ফেলছে। প্রবীণ কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, মার্কিন প্রশাসনের চেয়ে ইরানি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের মানসিকতা ও কৌশল অনেক বেশি নিখুঁতভাবে বুঝতে পারে। ফলে দশকের পর দশক ধরে চলা এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কৌশলগত ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসা আগামী দিনেও সহজ হবে না বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।