Dhaka ১০:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠাতা: এক ভিন্নধর্মী সাক্ষাতের পেছনের গল্প

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ Time View

সাহিত্যের পাতায় মানবজীবনের নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রের উন্মেষ ঘটিয়েছেন লেখক ও কথাসাহিত্যিকরা। তেমনি এক বাস্তব ও নাটকীয় অভিজ্ঞতার গল্প উঠে এসেছে কথাসাহিত্যিক রেজাউর রহমানের লেখায়, যা ১৯৯৯ সালে প্রখ্যাত সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। সরকারি দপ্তরের এক ব্যস্ত কর্মকতা এবং এক সাধারণ চরিত্রাভিনেতার আকস্মিক সাক্ষাতের প্রেক্ষাপটে রচিত এই আখ্যানে মানুষের জীবনের গভীর আকূতি, পেশাগত যান্ত্রিকতা এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গল্পের বর্ণনাকারী দীর্ঘ সরকারি চাকরির জীবনে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন এবং বহু মানুষের মুখোমুখি হয়েছেন। চাকরির শেষ প্রান্তে এসে তিনি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে বদলি হন। সেখানে মানুষের সরাসরি ভিড় কমে গেলেও টেলিফোন, ইন্টারকম এবং আধুনিক প্রযুক্তির নানা মাধ্যমে তদবির ও কাজের চাপ যেন আরও বেড়ে যায়। দুপুরের খাবারের পর যখন তিনি একটু বিশ্রামের চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই রিসেপশন থেকে ইন্টারকমের বেজে ওঠা তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিসিভার তুলে তিনি হরপ্রসাদ ভৌমিক নামের এক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে একটি সেবামূলক ও ভিন্নধর্মী প্রস্তাব নিয়ে দেখা করতে চান।

অরচনায় বাধাগ্রস্ত হয়ে সামান্য বিরক্তি নিয়েই কথাসহিত্যিক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে আসার অনুমতি দেন। নির্ধারিত সময়ে হাজির হন হরপ্রসাদ ভৌমিক—একজন হ্যাংলা-পাতলা দেহের সাধারণ মানুষ, যার পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক এবং সঙ্গে একটি বড় কালো হ্যান্ডব্যাগ। আলাপচারিতায় জানা যায়, হরপ্রসাদ পেশায় একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা বা চরিত্রাভিনেতা। তিনি এফডিসির শুটিং থেকে সরাসরি ওই সরকারি দপ্তরে এসেছেন। কখনো বিদেশি নাগরিক, কখনো উকিল কিংবা হোটেল ম্যানেজারের চরিত্রে অভিনয় করাই তার পেশা। তার এই পরিচয় শুনে কথক প্রথমে বিস্মিত হলেও ধীরে ধীরে তার মধ্যে কৌতূহল ও সহানুভূতি জন্ম নেয়।

হরপ্রসাদ ভৌমিকের এই দপ্তরে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তার মৃত পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘গঙ্গাপ্রসাদ পাবলিক লাইব্রেরি’র জন্য কিছু বই ও প্রকাশনা সংগ্রহ করা। অত্যন্ত সুন্দর ও পরিপাটি হাতে লেখা দুটি আবেদনপত্র তিনি কর্মকর্তার সামনে মেলে ধরেন। এই মহৎ উদ্যোগ দেখে কথকের মনে নিজের প্রয়াত বাবার কথা মনে পড়ে যায়, যিনি চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু কোনো স্থায়ী স্মৃতি রেখে যেতে পারেননি। হরপ্রসাদের এই মহৎ কাজ কথককে আত্মোপলব্ধির এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের মন ও মেধা গঠনের জন্য কাজ করা কতখানি মহৎ।

পরিশেষে, এই আখ্যানটি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার আকস্মিক সাক্ষাতের গল্প নয়; এটি মানবপ্রেম, স্মৃতির অমরত্ব এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক গভীর দলিল। যান্ত্রিক যুগেও যে মানুষ মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যেতে পারে, হরপ্রসাদ ভৌমিক তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাহিত্যের এই নান্দনিক রূপায়ন আজও পাঠকের মনে গভীর দাগ কেটে যায় এবং জীবনকে নতুনভাবে অনুধাবন করতে শেখায়।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে যাত্রীবেশে অটোরিকশাচালককে হত্যা ও ছিনতাইচেষ্টা

চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠাতা: এক ভিন্নধর্মী সাক্ষাতের পেছনের গল্প

Update Time : ০৯:০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

সাহিত্যের পাতায় মানবজীবনের নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রের উন্মেষ ঘটিয়েছেন লেখক ও কথাসাহিত্যিকরা। তেমনি এক বাস্তব ও নাটকীয় অভিজ্ঞতার গল্প উঠে এসেছে কথাসাহিত্যিক রেজাউর রহমানের লেখায়, যা ১৯৯৯ সালে প্রখ্যাত সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। সরকারি দপ্তরের এক ব্যস্ত কর্মকতা এবং এক সাধারণ চরিত্রাভিনেতার আকস্মিক সাক্ষাতের প্রেক্ষাপটে রচিত এই আখ্যানে মানুষের জীবনের গভীর আকূতি, পেশাগত যান্ত্রিকতা এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গল্পের বর্ণনাকারী দীর্ঘ সরকারি চাকরির জীবনে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন এবং বহু মানুষের মুখোমুখি হয়েছেন। চাকরির শেষ প্রান্তে এসে তিনি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে বদলি হন। সেখানে মানুষের সরাসরি ভিড় কমে গেলেও টেলিফোন, ইন্টারকম এবং আধুনিক প্রযুক্তির নানা মাধ্যমে তদবির ও কাজের চাপ যেন আরও বেড়ে যায়। দুপুরের খাবারের পর যখন তিনি একটু বিশ্রামের চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই রিসেপশন থেকে ইন্টারকমের বেজে ওঠা তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিসিভার তুলে তিনি হরপ্রসাদ ভৌমিক নামের এক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে একটি সেবামূলক ও ভিন্নধর্মী প্রস্তাব নিয়ে দেখা করতে চান।

অরচনায় বাধাগ্রস্ত হয়ে সামান্য বিরক্তি নিয়েই কথাসহিত্যিক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে আসার অনুমতি দেন। নির্ধারিত সময়ে হাজির হন হরপ্রসাদ ভৌমিক—একজন হ্যাংলা-পাতলা দেহের সাধারণ মানুষ, যার পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক এবং সঙ্গে একটি বড় কালো হ্যান্ডব্যাগ। আলাপচারিতায় জানা যায়, হরপ্রসাদ পেশায় একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা বা চরিত্রাভিনেতা। তিনি এফডিসির শুটিং থেকে সরাসরি ওই সরকারি দপ্তরে এসেছেন। কখনো বিদেশি নাগরিক, কখনো উকিল কিংবা হোটেল ম্যানেজারের চরিত্রে অভিনয় করাই তার পেশা। তার এই পরিচয় শুনে কথক প্রথমে বিস্মিত হলেও ধীরে ধীরে তার মধ্যে কৌতূহল ও সহানুভূতি জন্ম নেয়।

হরপ্রসাদ ভৌমিকের এই দপ্তরে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তার মৃত পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘গঙ্গাপ্রসাদ পাবলিক লাইব্রেরি’র জন্য কিছু বই ও প্রকাশনা সংগ্রহ করা। অত্যন্ত সুন্দর ও পরিপাটি হাতে লেখা দুটি আবেদনপত্র তিনি কর্মকর্তার সামনে মেলে ধরেন। এই মহৎ উদ্যোগ দেখে কথকের মনে নিজের প্রয়াত বাবার কথা মনে পড়ে যায়, যিনি চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু কোনো স্থায়ী স্মৃতি রেখে যেতে পারেননি। হরপ্রসাদের এই মহৎ কাজ কথককে আত্মোপলব্ধির এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের মন ও মেধা গঠনের জন্য কাজ করা কতখানি মহৎ।

পরিশেষে, এই আখ্যানটি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার আকস্মিক সাক্ষাতের গল্প নয়; এটি মানবপ্রেম, স্মৃতির অমরত্ব এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক গভীর দলিল। যান্ত্রিক যুগেও যে মানুষ মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যেতে পারে, হরপ্রসাদ ভৌমিক তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাহিত্যের এই নান্দনিক রূপায়ন আজও পাঠকের মনে গভীর দাগ কেটে যায় এবং জীবনকে নতুনভাবে অনুধাবন করতে শেখায়।