ইসলাম ধর্ম মানবজাতিকে পার্থিব জীবনের অসার মোহ ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে পরম সৃষ্টিকর্তার আশ্রয়ে প্রশান্তি অনুসন্ধানের এক বৈশ্বিক আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইসলামী জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। ধর্মীয় গবেষক ও আলেমদের মতে, দৈনন্দিন পার্থিব কাজের মধ্যেও সুনির্দিষ্ট কিছু আত্মিক নীতি ও বিশ্বাসের অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ তার স্রষ্টাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং জীবনের পরম সার্থকতা খুঁজে পায়।
ইসলামী চিন্তাধারায় পরম প্রতিপালকের ওপর অবিচল আস্থা স্থাপন করাকে ইমানের প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ইমরানের ৬ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাতৃগর্ভে মানুষের আকৃতি ও অস্তিত্বের সূচনার মূল নিয়ন্ত্রক কেবল মহান আল্লাহ। বস্তুত, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাক্যটি অন্তরে ধারণ করার অর্থ হলো নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে মহাবিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রতিপালকের অনুগত হওয়া। সহিহ বুখারির হাদিস অনুসারে, তিনটি মৌলিক গুণ অর্জন করতে পারলে মানুষ ইমানের আসল মাধুর্য ও স্বাদ আস্বাদন করতে পারে, যার প্রধানটি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বিশ্বের অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অধিক ভালোবাসা।
সৃষ্টিকর্তার কুদরত ও মহিমা উপলব্ধির দ্বিতীয় বড় মাধ্যম হলো প্রকৃতির নৈপুণ্য ও সৃষ্টির ভারসাম্য অনুধাবন করা। পবিত্র কোরআনের সুরা তাগাবুন ও সুরা মুলকে দৃশ্যমান বিশ্বজগতের সুবিন্যস্ত ও ত্রুটিহীন নকশার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মানুষের ভুলত্রুটি সত্ত্বেও পরম করুণাময় আল্লাহর রহমত তাঁর ক্রোধের ওপর সর্বদা প্রাধান্য পায়। সহিহ বুখারির বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ আছে, আরশে সংরক্ষিত গ্রন্থে মহান আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে তাঁর দয়া তাঁর রাগকে ছাড়িয়ে যাবে। সুরা শুরা অনুযায়ী, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে ক্ষয়ক্ষতি বা অনুশোচনা আসে, তা মানবীয় ভুলেরই ফল; তবে আল্লাহ বহু অপরাধ ক্ষমা করে থাকেন।
স্রষ্টার ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রদর্শিত সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে। সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্যই আল্লাহর ভালোবাসা ও পাপমোচন লাভের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ। হাদিসে কুদসির (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২) বিবরণ অনুযায়ী, বান্দা যখন নিয়মিত ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করে, তখন আল্লাহ তাকে এমনভাবে ভালোবাসেন যাতে তার দেখা, শোনা ও কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, এর অর্থ হলো মহান আল্লাহ বান্দার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপ ও অন্যায় থেকে হেফাজত করেন এবং কেবল সৎ ও পছন্দনীয় কাজে পরিচালিত করেন।
সর্বোপরি, ইমান কেবল মুখে স্বীকার বা কিছু বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ ও জীবনের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিক আত্মিক রূপান্তর। যখন একজন মানুষের সামাজিক আচার-ব্যবহার, নীতি-নৈতিকতা ও জীবনযাত্রায় বিশ্বাস এবং ভালোবাসার সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়, তখনই তার জীবনে স্রষ্টার উপস্থিতির প্রকৃত অনুভূতি জাগ্রত হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি বা পার্থিব অনিশ্চয়তার মুখে স্থিরচিত্ত থেকে স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখাই একজন প্রকৃত বিশ্বাসীর মূল পরিচয়।
Reporter Name 


















