রহস্যগল্প বলতেই সাধারণত শেষ পাতায় গিয়ে খুনিকে খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চকর এক ধাঁধাকে বোঝানো হয়। তবে জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক কেইগো হিগাশিনো এই গতানুগতিক ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর উপন্যাসে অনেক সময় গল্পের শুরুতেই অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায়, অথচ পাঠকের উত্তেজনার পারদ একটুও কমে না। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখির মাধ্যমে তিনি জাপানি রহস্যসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। গোয়েন্দা গল্প, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, বিজ্ঞানভিত্তিক জটিল রহস্য কিংবা অতিপ্রাকৃত প্রেক্ষাপট—প্রতিটি শাখায় তিনি নিজস্ব এক অনন্য কথনশৈলী তৈরি করেছিলেন। গত বছরের জুলাই মাসে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান এই ক্ষণজন্মা লেখক। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব সাহিত্যঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। কেইগো হিগাশিনোর বই কেবল জাপানি ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং অনূদিত হয়েছে বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় এবং রূপান্তর হয়েছে বিভিন্ন দেশের সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ ও নাটকে। পাঠকদের জন্য তাঁর সাহিত্যভুবনে প্রবেশের আদর্শ উপায় হতে পারে তাঁর পাঁচটি সর্বকালের সেরা উপন্যাস।
তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত উপন্যাস হলো ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স’। প্রচলিত রহস্যকাহিনির বিপরীতে এই উপন্যাসের শুরুতেই পাঠক জেনে যান অপরাধী কে। এরপর গল্প এগোয় এক কঠিন মনস্তাত্ত্বিক ধাঁধা নিয়ে—কীভাবে একটি হত্যাকাণ্ডকে এত নিখুঁতভাবে আড়াল করা সম্ভব। একজন নিভৃতচারী গণিতশিক্ষক নিজের প্রতিবেশীকে বাঁচাতে যে অসম্ভব পরিকল্পনা করেন, তার মুখোমুখি হন প্রতিভাবান পদার্থবিদ ও গোয়েন্দা মানাবু ইউকাওয়া, যিনি ‘ডিটেকটিভ গ্যালিলিও’ নামেও পরিচিত। বইটি পড়ার পর এর আবহ দীর্ঘদিন পাঠকের মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘ম্যালিস’ উপন্যাসে এক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নিজগৃহে খুন হন। আপাতদৃষ্টিতে একে লকড রুম মার্ডার মনে হলেও গোয়েন্দা কিয়োচিরো কাগার তদন্তে বেরিয়ে আসে আসল প্রশ্ন—খুনি কে নয়, বরং কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটল। মানবমনের ঈর্ষা, অহংকার এবং প্রতিশোধের নিখুঁত চিত্রায়ন এই উপন্যাসটিকে হিগাশিনোর অন্যতম সেরা পরিণত মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার করে তুলেছে।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘জার্নি আন্ডার দ্য মিডনাইট সান’ উপন্যাসে একটি পরিত্যক্ত ভবনে প্রাপ্ত মৃতদেহকে কেন্দ্র করে তদন্ত শুরু হলেও তা দুই দশক ধরে বিস্তৃত হয়। সময় ও সম্পর্কের পরিবর্তনের মাঝেও অতীতের ছায়া কীভাবে মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়, তার এক গভীর ট্র্যাজিক বয়ান এটি। অনেকের মতেই এটি হিগাশিনোর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। এছাড়া ২০০৮ সালের ‘স্যালভেশন অব আ সেইন্ট’ উপন্যাসে ফের দেখা মেলে ‘ডিটেকটিভ গ্যালিলিও’ সিরিজের। বিষক্রিয়ায় এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহের তির স্ত্রীর দিকে থাকলেও, ঘটনার সময় তিনি ছিলেন বহু দূরে। বিজ্ঞান ও যুক্তির মেলবন্ধনে গড়া এই তদন্ত মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলে। আর ১৯৯৮ সালের ‘নাওকো’ উপন্যাসটি গোয়েন্দা গল্পের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানবিক আবেদন তৈরি করে। এক বাস দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি ও চেতনা অলৌকিকভাবে মেয়ের শরীরে স্থানান্তরিত হলে স্বামী ও কন্যার সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে গড়ে ওঠে এই মনস্তাত্ত্বিক গল্প।
কেইগো হিগাশিনোর উপন্যাসের মূল শক্তি ছিল অপরাধের পেছনের মানবিক গল্পগুলোকে তুলে ধরা। তাঁর কাছে অপরাধ কেবল একটি ধাঁধা ছিল না; বরং ভালোবাসার আকুতি, অপরাধবোধ কিংবা সমাজের নির্মম বাস্তবতার কারণে অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত হওয়া মানুষের মনস্তত্ত্বই ছিল তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। তাঁর প্রয়াণের পরও তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম বিশ্বজুড়ে রহস্যপ্রেমী পাঠকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
Reporter Name 






















