Dhaka ০১:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কি তবে ইরানের হাতেই যাচ্ছে? ওমানের সঙ্গে চুক্তির গুঞ্জন

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৫:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ Time View

ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান প্রস্তাবিত একটি চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তেহরান। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা। তাঁরা জানিয়েছেন, এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে তা তেহরানের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানোর বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মূলত এই আলোচনা এগিয়ে চলেছে। তবে এই সম্ভাব্য সমঝোতা বা চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে খুব দ্রুতই একটি বড় ধরনের সমঝোতা চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা এর আগেও বারবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেলবাহী জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কোনো অবস্থাতেই তেহরানের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবিত এই চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জলযানগুলোর ওপর যদি ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তেহরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, এই সংঘাত শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ অবাধে ও বিনা মাশুলে চলাচল করত।

প্রণালিটির উত্তর অংশ ইরানের এবং দক্ষিণ অংশ ওমানের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশই এখন একটি স্থায়ী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বিধান অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে বাধ্যতামূলকভাবে ইরানের নির্ধারিত জলসীমা ব্যবহার করে চলাচল করতে হবে। গত জুলাই মাসে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চালানো তীব্র বিমান হামলাসহ মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক অভিযানই হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কমাতে পারেনি।

এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে একটি কড়া সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যদি তাদের মূল ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও তেল শোধনাগারগুলোতে কঠোর পাল্টা হামলা চালানো হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী পাঁচটি বিশ্বস্ত সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, ওয়াশিংটনকে নতুন কোনো সামরিক দুসাহসিকতা থেকে নিবৃত্ত করতেই মূলত এই আগাম বার্তা পাঠানো হয়েছে। উপসাগরীয় এক দেশের এক শীর্ষ সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইরানের বার্তাটি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার এবং আপসহীন—যুক্তরাষ্ট্র তাদের যেকোনো অবকাঠামোয় আঘাত হানলে আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বর্তমানে ইরান তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে এই অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলোকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করছে তাদের সামরিক বাহিনী। লাস ভেগাসে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি এখনো এই সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধানকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাই, কারণ আমি অযথা রক্তপাত বা মানুষ হত্যা করতে চাই না। কিন্তু পরিস্থিতির প্রয়োজনে হয়তো শেষ পর্যন্ত আমাকে সেই পথেই হাঁটতে হবে।’

ইরানি সরকারি সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। বিপরীতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে যে এই সংঘাতে তাদের মাত্র ১৮ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ইরানি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনা বেশ দূর এগোলেও কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। ফলে শিগগিরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একধরনের আইনি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন নীতির কিছুটা নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে সুনির্দিষ্টভাবে কী বোঝানো হবে, তার রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো চাচ্ছে যেন বাণিজ্যিক জাহাজের তল্লাশি বা সুরক্ষার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর যৌথ কাঠামোর হাতে থাকে এবং কোনো ধরনের মাসুল বা ফি আদায় করা হলে তা যেন কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক না হয়। অন্যদিকে, ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তেহরান এই প্রণালি ব্যবহারকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজের বহন করা পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি বা মাশুল আদায় করতে চায়। বিপরীতে, ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের আর্থিক মাশুল আদায়ের ঘোর বিরোধিতা করছে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যাতে উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সম্পূর্ণরূপে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করে, বর্তমান ব্যবস্থাটি সেভাবেই নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ওমানের সঙ্গে হওয়া আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং একটি মৌলিক সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। ঘারিবাবাদি আরও দাবি করেছেন যে, জুনের মাঝামাঝিতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যদি পুরোপুরি ফিরে আসে, তবেই কেবল এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি বা উন্মুক্ত আলোচনা চলছে না বলেই তিনি নিশ্চিত করেছেন।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: রাষ্ট্র সংস্কার ও অসমাপ্ত এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথরেখা

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কি তবে ইরানের হাতেই যাচ্ছে? ওমানের সঙ্গে চুক্তির গুঞ্জন

Update Time : ১২:০৫:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান প্রস্তাবিত একটি চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তেহরান। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা। তাঁরা জানিয়েছেন, এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে তা তেহরানের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানোর বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মূলত এই আলোচনা এগিয়ে চলেছে। তবে এই সম্ভাব্য সমঝোতা বা চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে খুব দ্রুতই একটি বড় ধরনের সমঝোতা চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা এর আগেও বারবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেলবাহী জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কোনো অবস্থাতেই তেহরানের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবিত এই চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জলযানগুলোর ওপর যদি ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তেহরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, এই সংঘাত শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ অবাধে ও বিনা মাশুলে চলাচল করত।

প্রণালিটির উত্তর অংশ ইরানের এবং দক্ষিণ অংশ ওমানের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশই এখন একটি স্থায়ী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বিধান অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে বাধ্যতামূলকভাবে ইরানের নির্ধারিত জলসীমা ব্যবহার করে চলাচল করতে হবে। গত জুলাই মাসে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চালানো তীব্র বিমান হামলাসহ মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক অভিযানই হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কমাতে পারেনি।

এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে একটি কড়া সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যদি তাদের মূল ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও তেল শোধনাগারগুলোতে কঠোর পাল্টা হামলা চালানো হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী পাঁচটি বিশ্বস্ত সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, ওয়াশিংটনকে নতুন কোনো সামরিক দুসাহসিকতা থেকে নিবৃত্ত করতেই মূলত এই আগাম বার্তা পাঠানো হয়েছে। উপসাগরীয় এক দেশের এক শীর্ষ সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইরানের বার্তাটি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার এবং আপসহীন—যুক্তরাষ্ট্র তাদের যেকোনো অবকাঠামোয় আঘাত হানলে আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বর্তমানে ইরান তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে এই অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলোকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করছে তাদের সামরিক বাহিনী। লাস ভেগাসে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি এখনো এই সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধানকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাই, কারণ আমি অযথা রক্তপাত বা মানুষ হত্যা করতে চাই না। কিন্তু পরিস্থিতির প্রয়োজনে হয়তো শেষ পর্যন্ত আমাকে সেই পথেই হাঁটতে হবে।’

ইরানি সরকারি সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। বিপরীতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে যে এই সংঘাতে তাদের মাত্র ১৮ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ইরানি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনা বেশ দূর এগোলেও কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। ফলে শিগগিরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একধরনের আইনি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন নীতির কিছুটা নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে সুনির্দিষ্টভাবে কী বোঝানো হবে, তার রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো চাচ্ছে যেন বাণিজ্যিক জাহাজের তল্লাশি বা সুরক্ষার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর যৌথ কাঠামোর হাতে থাকে এবং কোনো ধরনের মাসুল বা ফি আদায় করা হলে তা যেন কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক না হয়। অন্যদিকে, ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তেহরান এই প্রণালি ব্যবহারকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজের বহন করা পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি বা মাশুল আদায় করতে চায়। বিপরীতে, ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের আর্থিক মাশুল আদায়ের ঘোর বিরোধিতা করছে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যাতে উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সম্পূর্ণরূপে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করে, বর্তমান ব্যবস্থাটি সেভাবেই নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ওমানের সঙ্গে হওয়া আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং একটি মৌলিক সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। ঘারিবাবাদি আরও দাবি করেছেন যে, জুনের মাঝামাঝিতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যদি পুরোপুরি ফিরে আসে, তবেই কেবল এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি বা উন্মুক্ত আলোচনা চলছে না বলেই তিনি নিশ্চিত করেছেন।