Dhaka ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষ কি স্বাধীন নাকি তকদিরের অধীন? ইসলামি দর্শনে ভাগ্য ও কর্ম স্বাধীনতার গভীর বিশ্লেষণ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৬ Time View

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা এবং পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য বা তকদিরের সম্পর্ক নিয়ে মানবজাতির কৌতূহল সুপ্রাচীন। জীবনের প্রতিটি বাঁক কি আগে থেকেই নির্ধারিত, নাকি আমাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মপ্রয়াসের প্রকৃত স্বাধীনতা রয়েছে? এই মৌলিক দার্শনিক ও ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরগণ গভীর তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, মূল বিভ্রান্তিটি তৈরি হয় যখন মানুষ আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান এবং মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার সঠিক সম্পর্কটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। তকদিরকে যদি কেউ দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কিংবা মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে, তবে তা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষকে অন্ধ বাধ্যবাধকতার ভেতর আটকে রাখা হয়নি, বরং তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করার জন্য স্বাধীন ইচ্ছা বা ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।

কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আজ-জারিয়াত, আয়াত ৫৬)। এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত মুফাসসির ও সাহাবি হজরত আলী (রা.) উল্লেখ করেছেন যে, এর অর্থ মানুষকে জোরপূর্বক ইবাদত করাতে বাধ্য করা নয়, বরং তাকে ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া এবং সেদিকে আহ্বান জানানোই উদ্দেশ্য। ফেরেশতাদের মতো মানুষের স্বভাব সবসময় জন্মগতভাবে বাধ্যগত নয়; বরং তাকে ভালো ও মন্দের পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। ইসলামি দর্শনে আল্লাহর ইচ্ছাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—একটি হলো প্রাকৃতিক নিয়ম বা তাকদীরের অপরিবর্তনীয় দিক, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই (যেমন জন্ম, মৃত্যু, শারীরিক গঠন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ)। অন্যটি হলো নৈতিক বিধান বা শরিয়ত, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন সদিচ্ছা প্রয়োগ করে ভালো বা মন্দ পথ বেছে নিতে পারে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন মানুষ ভবিষ্যতে কী করবে, তবে তো মানুষের আর কোনো স্বাধীন বিকল্প থাকে না। এই জটিল মানসিকতার জবাবে ইসলামী গবেষক ও আল্লামা ইবনে আশুর স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো কিছু ‘আগে থেকেই জানা’ আর কাউকে ‘সেই কাজ করতে বাধ্য করা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। আল্লাহর অসীম জ্ঞান হলো আলোর মতো, যা ঘটনার সত্যতা ও পরিণতি উন্মোচন করে মাত্র; কিন্তু তা মানুষের ওপর কোনো ধরনের জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করে না। মানুষ নিজ ইচ্ছায় কর্ম সম্পাদন করে বলেই সে পরকালে তার কাজের জন্য পুরস্কার বা শাস্তির মুখোমুখি হয়। যদি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকত, তবে বেহেশত বা দোজখের হিসাব নেওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকত না।

ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ার প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিবৃত করেছেন স্বয়ং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সাহাবিরা একবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সবকিছু যদি আগে থেকেই লেখা হয়ে থাকে, তবে কি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না?’ উত্তরে প্রিয়নবী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘না, বরং তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজে লিপ্ত থাকো; কারণ যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)। প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি ও ইমাম ইবনে বাত্তাল এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পথ সুগম করে দেওয়া মানে মানুষকে পরাধীন করে দেওয়া নয়, বরং মানুষের অর্জিত প্রচেষ্টার অনুকূলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা। পরিশেষে বলা যায়, তকদির মানুষকে পঙ্গু বা কর্মহীন করে দেওয়ার কোনো ধারণা নয়; বরং এটি মানুষকে সফলতায় অহংকারমুক্ত এবং ব্যর্থতায় হতাশামুক্ত রাখতে শেখায়।

Write Your Comment

About Author Information

Popular Post

কার্টার থেকে ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যেভাবে ধোঁয়াশায় রেখেছেন ইরানের নেতারা

মানুষ কি স্বাধীন নাকি তকদিরের অধীন? ইসলামি দর্শনে ভাগ্য ও কর্ম স্বাধীনতার গভীর বিশ্লেষণ

Update Time : ০৫:০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা এবং পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য বা তকদিরের সম্পর্ক নিয়ে মানবজাতির কৌতূহল সুপ্রাচীন। জীবনের প্রতিটি বাঁক কি আগে থেকেই নির্ধারিত, নাকি আমাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মপ্রয়াসের প্রকৃত স্বাধীনতা রয়েছে? এই মৌলিক দার্শনিক ও ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরগণ গভীর তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, মূল বিভ্রান্তিটি তৈরি হয় যখন মানুষ আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান এবং মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার সঠিক সম্পর্কটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। তকদিরকে যদি কেউ দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কিংবা মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে, তবে তা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষকে অন্ধ বাধ্যবাধকতার ভেতর আটকে রাখা হয়নি, বরং তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করার জন্য স্বাধীন ইচ্ছা বা ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।

কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আজ-জারিয়াত, আয়াত ৫৬)। এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত মুফাসসির ও সাহাবি হজরত আলী (রা.) উল্লেখ করেছেন যে, এর অর্থ মানুষকে জোরপূর্বক ইবাদত করাতে বাধ্য করা নয়, বরং তাকে ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া এবং সেদিকে আহ্বান জানানোই উদ্দেশ্য। ফেরেশতাদের মতো মানুষের স্বভাব সবসময় জন্মগতভাবে বাধ্যগত নয়; বরং তাকে ভালো ও মন্দের পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। ইসলামি দর্শনে আল্লাহর ইচ্ছাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—একটি হলো প্রাকৃতিক নিয়ম বা তাকদীরের অপরিবর্তনীয় দিক, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই (যেমন জন্ম, মৃত্যু, শারীরিক গঠন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ)। অন্যটি হলো নৈতিক বিধান বা শরিয়ত, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন সদিচ্ছা প্রয়োগ করে ভালো বা মন্দ পথ বেছে নিতে পারে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন মানুষ ভবিষ্যতে কী করবে, তবে তো মানুষের আর কোনো স্বাধীন বিকল্প থাকে না। এই জটিল মানসিকতার জবাবে ইসলামী গবেষক ও আল্লামা ইবনে আশুর স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো কিছু ‘আগে থেকেই জানা’ আর কাউকে ‘সেই কাজ করতে বাধ্য করা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। আল্লাহর অসীম জ্ঞান হলো আলোর মতো, যা ঘটনার সত্যতা ও পরিণতি উন্মোচন করে মাত্র; কিন্তু তা মানুষের ওপর কোনো ধরনের জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করে না। মানুষ নিজ ইচ্ছায় কর্ম সম্পাদন করে বলেই সে পরকালে তার কাজের জন্য পুরস্কার বা শাস্তির মুখোমুখি হয়। যদি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকত, তবে বেহেশত বা দোজখের হিসাব নেওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকত না।

ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ার প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিবৃত করেছেন স্বয়ং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সাহাবিরা একবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সবকিছু যদি আগে থেকেই লেখা হয়ে থাকে, তবে কি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না?’ উত্তরে প্রিয়নবী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘না, বরং তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজে লিপ্ত থাকো; কারণ যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)। প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি ও ইমাম ইবনে বাত্তাল এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পথ সুগম করে দেওয়া মানে মানুষকে পরাধীন করে দেওয়া নয়, বরং মানুষের অর্জিত প্রচেষ্টার অনুকূলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা। পরিশেষে বলা যায়, তকদির মানুষকে পঙ্গু বা কর্মহীন করে দেওয়ার কোনো ধারণা নয়; বরং এটি মানুষকে সফলতায় অহংকারমুক্ত এবং ব্যর্থতায় হতাশামুক্ত রাখতে শেখায়।